বিশেষ সংবাদদাতা, কলকাতা:
উত্তর কলকাতার চোরবাগান দুর্গোৎসব মণ্ডপের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা এবং সেই পুজোয় দেবী প্রতিমার রূপায়ণকে কেন্দ্র করে গত কয়েক দিন ধরে সমাজমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক ও নানা মনগড়া তত্ত্বের ঝড় উঠেছে। এক পক্ষ যেখানে পুজোর আচার ও প্রতিমার গঠনশৈলীকে মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও কালিকা পুরাণের নির্দেশিকার পরিপন্থী বলে দাবি করে একে “অশাস্ত্রীয়” এবং প্রাচীন ক্যানানাইট দেবতা ‘বাল’ (Baal)-এর সঙ্গে তুলনা করে দুর্ঘটনার জন্য একে দায়ী করছে, অন্য পক্ষ আবার এই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছে। এই সমগ্র বিতর্ক ও জনমানসে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তির নেপথ্যের সত্যতা নিয়ে নানা মহলে শুরু হয়েছে গভীর পর্যালোচনা।
আরও পড়ুনঃ চোরবাগানে ‘ভুয়ো’ ঘোষণার মূলচক্রী! কোচবিহার থেকে গ্রেফতার যুবক
শাস্ত্রীয় বিতর্ক ও প্রতিমার রূপায়ণ নিয়ে প্রশ্ন
সমালোচকদের একটি অংশ দাবি করেছেন, মার্কণ্ডেয় পুরাণের চণ্ডী বা দেবী মাহাত্ম্য এবং কালিকা পুরাণ অনুযায়ী দেবী দুর্গা হলেন মহিষাসুরমর্দিনী—যিনি ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে এক পা সিংহের ও এক পা পরাজিত মহিষাসুরের বুকে রেখে দশ হাতে দশ অস্ত্র ধারণ করেন। কিন্তু চোরবাগানের প্রতিমায় দেবীকে নিরস্ত্র, যোগমুদ্রায় পদ্মাসনে উপবিষ্ট এবং কোলে পদ্মসহ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি, দেবীর পদতলে মহিষাসুরকে শিবতুল্য তপস্বী রূপে এবং তার নীচে কালনাগ প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়ে শাস্ত্রীয় বিশেষজ্ঞদের একাংশ প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের মতে, শাস্ত্রসম্মত নিয়মের বাইরে গিয়ে করা এই ধরনের কল্পিত শিল্পরীতি বা রূপায়ণ অনেক সময় জনমানসে বিভ্রান্তি তৈরি করে।
‘বাল’ (Baal) তত্ত্ব ও অন্ধ বিশ্বাসের বিতর্ক
ঘটনার পর সমাজমাধ্যমে একশ্রেণির নেটিজেন দাবি করতে শুরু করেন যে চোরবাগানের মণ্ডপের অসুরের রূপটি আসলে প্রাচীন কেনোনাইট ও উগারিতীয় সভ্যতার কৃষি ও উর্বরতার দেবতা ‘বাল’-এর আদলে তৈরি, যা বাইবেলের দৃষ্টিতে একধরনের ‘ডিমন’ বা অপদেবতা। অতীতে এই দেবতার পুজোয় বলিদান প্রথার প্রসঙ্গ টেনে তাঁদের দাবি ছিল, এই বিগ্রহের কারণেই মণ্ডপে দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং বহু প্রাণহানি হয়েছে।
তবে ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ এই তত্ত্বকে চরম অবৈজ্ঞানিক ও হাস্যকর বলে খারিজ করে দিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যের কৃষি দেবতা ‘বাল’ আদতে কোনো কাল্পনিক রাক্ষস বা শয়তান ছিলেন না; হিব্রু ভাষায় ‘বাল’ শব্দের অর্থ ‘প্রভু’ বা ‘স্বামী’। পরবর্তীকালে একেশ্বরবাদী ধর্মীয় প্রচারের ফলে প্রাচীন বিভিন্ন সংস্কৃতির বহু দেব-দেবীকে নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল। চোরবাগানের অসুরের সঙ্গে ওই প্রাচীন দেবতার চেহারার কোনো বাস্তব সাদৃশ্যও নেই।
আরও পড়ুনঃ ফ্রান্সের একাধিক শহরে জারি হচ্ছে কারফিউ; বিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স
দুর্ঘটনার দায় এড়ানোর রাজনৈতিক কৌশল?
বিশ্লেষকদের মতে, চোরবাগানের মতো একটি জনবহুল মণ্ডপে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনের ব্যর্থতা থেকে মানুষের নজর ঘুরিয়ে দিতেই এই ধরনের অবৈজ্ঞানিক ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন ‘বাল’ তত্ত্ব বাজারে ছাড়া হয়েছে। উৎসবের আবহে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার আসল কারণ—অর্থাৎ অপর্যাপ্ত ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট এবং অব্যবস্থাপনা—থেকে মনোযোগ সরিয়ে দিয়ে ধর্মীয় আবেগ ও অন্ধবিশ্বাসের জিগির তোলার পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। সব মিলিয়ে, একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে অবৈজ্ঞানিক তত্ত্বে সিলমোহর দেওয়ার প্রবণতা যে সমাজকে ভুল পথে চালিত করছে, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বুদ্ধিজীবীরা।


