বিশেষ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত সংবাদ প্রতিবেদন:
দীপান্বিতা অমাবস্যায় যখন গোটা দেশ কালীপুজোর ভক্তি আর দীপাবলির আলোর রোশনাইতে মেতে উঠেছে, ঠিক তখনই এক সম্পূর্ণ বিপরীত ও ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের সাক্ষী রইল বাঁকুড়ার মন্দিরনগরী বিষ্ণুপুর। শহরের পাটরাপাড়ার ঐতিহ্যবাহী রক্ষিত পরিবারে কালীপুজোর আবহে আরাধনা শুরু হলো দেবী দুর্গার। বিগত দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে অমাবস্যার এই বিশেষ তিথিতে পারিবারিক দুর্গাপূজা শুরু করাই এই পরিবারের মূল দস্তুর। শুধু বোধান বা সময়ের ফারাকই নয়, প্রতিমার গঠনেও রয়েছে এক অপূর্ব ভিন্নতা—এখানে দেবী অসুরদলিনী মহিষাসুরমর্দিনী নন, বরং স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে তিনি পূজিতা হন এক পরম স্নেহময়ী ঘরের মেয়ে ‘উমা’ রূপেই।
১. তসরের জঙ্গল থেকে স্বপ্নাদেশ: দু’শতক প্রাচীন অলৌকিক ইতিহাস
পরিবারের ইতিহাস ও লোকশ্রুতি অনুযায়ী, এই পুজোর সূচনার নেপথ্যে রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা:
-
জঙ্গলে দেবীর দর্শন: প্রায় ২০০ বছর আগে রক্ষিত পরিবারের এক পূর্বপুরুষ সাধারণ দুর্গাপূজার পর তসরের রেশমগুটি সংগ্রহের উদ্দেশ্যে পুরুলিয়ার গভীর জঙ্গলে যান। তসরের সন্ধানে সারাদিন ঘোরাঘুরির পর ক্লান্ত হয়ে তিনি এক বৃক্ষছায়ায় ঘুমিয়ে পড়েন।
-
স্বপ্নাদেশ ও প্রতিমার রূপ: কথিত আছে, সেই সুপ্তাবস্থাতেই দেবী দুর্গা তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দেন। দেবী নির্দেশ দেন বিষ্ণুপুরের নিজ ভিটায় তাঁর প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে দীপান্বিতা অমাবস্যায় পূজার সূচনা করতে। স্বপ্নে তিনি দেবীকে শান্ত ও সপরিবার রূপে প্রত্যক্ষ করেন। পরবর্তীতে পরিবারের অন্য সদস্যরাও তাঁদের নিজস্ব তাঁতশালে দেবীর সেই অলৌকিক সপরিবার মূর্তি দেখতে পান বলে দাবি করা হয়।
২. কালীপুজোর অমাবস্যায় বোধন ও চার দিনের পূজা
স্বপ্নাদেশের সেই স্মৃতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে আজও অমাবস্যার তিথিতেই শুরু হয় এই দুর্গোৎসব:
-
চার দিনের আরাধনা: মহালয়া বা শারদীয়া পক্ষ নয়, বরং দীপান্বিতা অমাবস্যায় রীতি মেনে ঘট স্থাপন ও বোধনের মাধ্যমে রক্ষিত পরিবারের দুর্গাপূজা শুরু হয়ে পরবর্তী চার দিন ধরে সাড়ম্বরে চলে।
-
অসুরহীন প্রতিমা: বিষ্ণুপুরের এই মণ্ডপে দেবী উগ্র রূপ ধারণ করেন না। অসুর ও অস্ত্রের তাণ্ডব এড়িয়ে স্বামী শিব এবং কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে নিয়ে একদম শান্ত ও মাতৃরূপে তিনি মণ্ডপে বিরাজ করেন।
আরও পড়ুনঃ রেলের অব্যবস্থা নিয়ে ক্ষোভ তুঙ্গে! কবিগুরুর নামে চলা এক্সপ্রেসে উপচে পড়া ভিড়; সংরক্ষিত ‘এস-২’ কামরায় ঠাসাঠাসি ভিড়, টয়লেটেও যাত্রীর ঢল
৩. ‘ঘরের মেয়ে’ উমা এবং ভাইফোঁটার বিসর্জন বিধি
রক্ষিত পরিবারে দেবী দুর্গাকে পরম আদরে ঘরের কন্যা হিসেবে গণ্য করা হয়, যা তাঁদের আচার-বিধিতে স্পষ্ট:
-
ভাইফোঁটার পূর্বে নেই বিসর্জন: চার দিনের পুজো শেষ হলেও ভাইফোঁটার আগে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পরিবারের বিশ্বাস, ঘরের মেয়ে বাপের বাড়িতে এসে ভাইফোঁটা না দিয়ে ফিরে যেতে পারে না।
-
পরিবারের কড়া নিয়ম: দেশ-বিদেশ থেকে যে সমস্ত আত্মীয়-স্বজন এই ঐতিহ্যে যোগ দিতে বিষ্ণুপুরে আসেন, দেবীর বিসর্জনের আগে তাঁদের বাড়ি ফিরে যাওয়াও নিয়মবিরুদ্ধ।
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এতটুকু শিথিল হয়নি এই পরিবারের ভক্তি বা আচার-অনুষ্ঠান। অমাবস্যার আলো-আঁধারিতে কালীপুজোর পাশাপাশি দুর্গার এই বিশেষ আরাধনা বিষ্ণুপুরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে যোগ করেছে এক অনন্য মাত্রা।


