কর্মীদের ত্যাগের মূল্য কোথায়?
যে হাতে গত ৪ ই মে এর আগে পর্যন্ত বিজেপির পতাকা ছিঁড়েছে, যে কণ্ঠে বিজেপি কর্মীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার হয়েছে, যে নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় অসংখ্য কর্মী ঘরছাড়া হয়েছে, মিথ্যা গাঁজা, অস্ত্র ও শ্লীলতাহানির মামলায় জেল খেটেছে, রাজনৈতিক সন্ত্রাসে প্রাণ হারিয়েছেন যাদের কারনে সেই মানুষগুলোকেই যদি ফুলের মালা পরিয়ে দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়, তাহলে ত্যাগী কর্মীদের বুকের ক্ষত আরও গভীর হওয়াই স্বাভাবিক।
যারা প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিল, “৪ তারিখ তৃণমূল জিতলে বিজেপি কর্মীদের ডিজে বাজিয়ে উল্লাস করব”, যারা বছরের পর বছর বিজেপি করার অপরাধে সাধারণ কর্মীদের উপর অকথ্য অত্যাচার চালিয়েছে, ভোট মিটতেই তাদেরই যদি কয়েক দিনের মধ্যে সম্মান, পদ ও ক্ষমতার আসনে বসানো হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই এটাই কি সেই আদর্শের রাজনীতি, যার জন্য হাজার হাজার কর্মী রক্ত দিয়েছেন, জেল খেটেছেন, সর্বস্ব হারিয়েছেন?
আরও পড়ুনঃ ৩ ‘ভাল তৃণমূল’কে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় গৃহযুদ্ধ BJP কর্মী-সমর্থকদের
কর্মীরা বলছেন দল শক্তিশালী হোক, নতুন মানুষ আসুক এতে আপত্তি নেই। কিন্তু যারা গতকাল পর্যন্ত নির্যাতনের প্রতীক ছিল, তাদের ত্যাগী কর্মীদের মাথার উপর বসিয়ে দেওয়া হলে তা শুধু কর্মীদের মনোবল ভাঙে না, দলের আদর্শ ও আত্মত্যাগের মূল্যবোধকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।যদি কাউকে দলে নেওয়ারই প্রয়োজন হয়, তাহলে আগে তাকে সাধারণ সদস্য হিসেবে কাজ করতে দেওয়া যেত। মাঠে নেমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে হতো। কর্মীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগঠন করতে হতো। তারপর যোগ্যতা প্রমাণের ভিত্তিতে বড় দায়িত্ব দেওয়া যেত। কিন্তু সেই ধাপগুলো এড়িয়ে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদ বা রাজ্যসভার মতো সম্মানজনক আসনে বসিয়ে দেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।
বিজেপির কি সত্যিই যোগ্য মানুষের অভাব আছে? এই দলে এমন অসংখ্য কর্মী আছেন, যারা বছরের পর বছর রোদে-জলে, অত্যাচার-হুমকির মধ্যেও দলের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। অনেকেই মামলা খেয়েছেন, মার খেয়েছেন, চাকরি হারিয়েছেন, সামাজিকভাবে অপমানিত হয়েছেন। অথচ তাঁদেরই মূল্যায়ন নেই। তাঁদের ত্যাগ যেন আজ গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে।
সংগঠন শক্তিশালী করতে হলে শুধু পরিচিত নেতা আনলেই হবে না। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে সৎ, শিক্ষিত, ভদ্র, কর্মঠ এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য তরুণ-তরুণীদের সামনে আনতে হবে। যাঁদের নিজস্ব ভাবমূর্তি আছে, মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আছে, সমাজের জন্য কাজ করার মানসিকতা আছে তাঁদেরই দায়িত্ব দিতে হবে। এভাবেই একটি রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হয়।
আজ যারা সুযোগ বুঝে দল বদলাচ্ছেন, তাঁদের অনেকেরই নিজস্ব জনভিত্তি নেই। তাঁদের ডাকে দশজন মানুষও রাস্তায় নামবেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। শুধু অন্য দল থেকে এসেছে বলেই যদি সম্মান ও পদ দেওয়া হয়, তাহলে দীর্ঘদিনের কর্মীদের কাছে কী বার্তা যাবে? এতে কি কর্মীদের মনোবল বাড়বে, নাকি ভেঙে পড়বে?
সবচেয়ে বড় কথা, আদর্শহীন রাজনীতি কখনও স্থায়ী হয় না। আজ যারা সুবিধার জন্য দল বদলায়, তারা আগামীকাল আরও বড় সুবিধার জন্য আবার অন্য দলে চলে যাবে এই আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক লাভের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে সংগঠনই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
মিডিয়ার সামনে এমন বার্তা দেবেন না, যাতে মনে হয় দীর্ঘদিনের কর্মীদের কোনও মূল্য নেই। যারা বছরের পর বছর দলকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তাদের বুকের কষ্টটাও বোঝার চেষ্টা করুন। কর্মীদের সম্মান না দিলে সংগঠনের ভিত দুর্বল হয়ে যায়। একটি রাজনৈতিক দল শুধু বড় বড় নেতাদের উপর দাঁড়িয়ে থাকে না; অগণিত নীরব, নিষ্ঠাবান কর্মীর ত্যাগ, পরিশ্রম ও বিশ্বাসের উপরই তার ভিত্তি গড়ে ওঠে।
তাই সময় থাকতে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা দরকার। দলকে শক্তিশালী করতে হলে আদর্শ, নিষ্ঠা, ত্যাগ এবং কর্মীদের সম্মান এই চারটি বিষয়কেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে এবং কর্মীদের মধ্যে নতুন করে আস্থা ফিরে আসবে।
আরও পড়ুনঃ সব কিছুর একটা সীমা থাকে; অভিষেককে ভর্ৎসনা হাইকোর্টের
মনে রাখা উচিত বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বের বাংলার মাটিতে বিজেপির আজকের অবস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-এর আদর্শ, অসংখ্য কর্মীর রক্ত, ত্যাগ, লাঞ্ছনা ও দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই সাফল্য এসেছে। আবার বলছি বছরের পর বছর অত্যাচার সহ্য করেও কর্মীরা পদ্ম পতাকা হাতে বাংলার মানুষের বিশ্বাস অর্জন করেছেন। তাই আজ এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যা সেই ত্যাগকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় বা কর্মীদের মনে অবমূল্যায়নের অনুভূতি সৃষ্টি করে। বাংলার মানুষ পরিবর্তনের আশায়, সুশাসনের প্রত্যাশায় বিজেপিকে ক্ষমতায় এনেছেন। সেই আস্থা রক্ষা করা আজ দলের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।এই দলের উত্থান শুধু রাজনৈতিক অঙ্কের ফল নয়,৩৫০-রও বেশি কর্মী-সমর্থকের আত্মবলিদান, লক্ষ লক্ষ কর্মীর ত্যাগ এবং অগণিত সাধারণ মানুষের আবেগের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের এই অবস্থান তৈরি হয়েছে।
প্রান্তিক গ্রামের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ নিজের রোজগার বন্ধ রেখে, তৃণমূলের হুমকি, ভয়ভীতি ও অত্যাচার সহ্য করেও শুধু দলের প্রতি বিশ্বাস ও আবেগের টানে মিছিল-মিটিং করেছে। কারণ তাদের কাছে দল ছিল শুধু একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়, একটি বিশ্বাসের নাম।
তাই কর্মীদের আবেগকে যদি গুরুত্ব না দেওয়া হয়, তাহলে “৪০০ পার”এর স্বপ্ন দেখতে গিয়ে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, ভবিষ্যতেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এইভাবে চললে পশ্চিমবঙ্গে পৌর নির্বাচন ও পঞ্চায়েত নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেতে চলছে বিজেপি।


