সংখ্যা দিয়ে ক্যালেন্ডারের জন্মেরও বহু আগের কাহিনি। হাজার হাজার বছর ধরে মানুষ প্রকৃতির রূপ পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই নতুন বছরকে আবাহন করে নিত। সূর্যের (আদতে পৃথিবীর) গতিপ্রকৃতি দেখেই নতুন বছরের হিসাব করত। একসময় এসে এক রোমান সম্রাট ঘোষণা দিলেন— নতুন বছর শুরু হবে জানুস দেবতার সম্মানে। জানুস প্রাচীন রোমান পুরাণের এমন এক দেবতা, যিনি শুরু, শেষ, দ্বার পরিবর্তনের সময় এবং দ্বৈততার দেবতা। যাঁকে দুটি বিপরীতমুখী মুখওয়ালা প্রতিমূর্তি হিসাবে দেখানো হয়, যা অতীত ও ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে। জানুয়ারি মাসের নামকরণও এই দেবতার নাম থেকেই হয়েছে, কারণ তিনি নতুন বছরের শুরুকে প্রতিনিধিত্ব করেন।

ক্যালেন্ডার সময়কে সংখ্যায় ভাগ করার আগের যুগে মানুষ প্রকৃতির পরিবর্তনের মধ্যেই বছরের নবসূচনাকে চিনত। নতুন বছর আসত কোনও দৈব আদেশে নয়, আক্ষরিক প্রমাণে। নতুন বীজবপন করা শস্যের অঙ্কুরোদ্গমের মধ্যে, যখন বন্যার জল সরে উর্বর মাটি ফের শস্য বোনার উপযোগী হয়ে উঠত, যখন সূর্য তার সর্বনিম্ন পথ পেরিয়ে ধীরে ধীরে উত্তরায়ণ শুরু করত—তখনই শুরু হতো নতুন বর্ষের চক্র।
আরও পড়ুনঃ আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা; খালেদার শেষযাত্রায় মানুষের ঢল
সিন্ধু সভ্যতা, নীলনদের তীর, মেসোপটেমিয়ার সমভূমি— সব জায়গাতেই মানুষ সময় পড়ত প্রকৃতির লেখায়। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি, যবের সোনালি রং, বিষুবের দিনে আলো ও ছায়ার নিখুঁত ভারসাম্য— এসবই ছিল বছরের সন্ধিক্ষণ। নতুন করে শুরু মানে ছিল চাষের জমি প্রস্তুত, নবজীবনের জেগে ওঠা। সময় তখন বিমূর্ত ধারণা নয়, মাঠে-ঘাটে দেখা বাস্তব অভিজ্ঞতা।
প্রাচীন রোমে শুরুতে ছিল মাত্র দশ মাস। আর বছরের শুরু ধরা হতো মার্চে— মঙ্গল দেবতার নামে। শীতের অবসান মানেই তখন চাষাবাদ আর সামরিক অভিযানের সময়। বসন্ত মানে পরিকল্পনা, নির্মাণ, সাম্রাজ্য বিস্তার। প্রকৃতি আর রাষ্ট্রক্ষমতা একই তালে চলত। আজও সেই ভুল গণনার ছাপ রয়ে গিয়েছে আমাদের ক্যালেন্ডারে। সেপ্টেম্বর, অক্টোবর, নভেম্বর, ডিসেম্বর—নাম অনুযায়ী যেগুলো ছিল সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম মাস, সেগুলো এখন নবম থেকে দ্বাদশ হয়ে গিয়েছে।
খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ৭০০ সালের দিকে রোমের দার্শনিক রাজা নুমা পম্পিলিয়াস সময়ের কাঠামো বদলে দিলেন। তিনি শীতের ফাঁকা সময় থেকে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি যোগ করলেন এবং বছরের সূচনা বসন্ত থেকে সরিয়ে দিলেন শীতের মাঝখানে।

জানুয়ারি নাম পেল জানুস দেবতার নাম থেকে— সূচনার দেবতা। এটাই ছিল রোমের প্রথম বড় “সময়-রাজনীতি”: প্রকৃতির হাত থেকে সময় ছিনিয়ে নিয়ে তাকে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে রূপ দেওয়া।
রোমান ধর্মাচারে জানুসকে সবার আগে স্মরণ করা হতো— এমনকী বৃহস্পতিরও আগে। কোনও কাজ, কোনও যাত্রা, কোনও আচার-অনুষ্ঠান তাঁর নাম ছাড়া শুরু হতো না। তিনি পথ খুলে দেন। জানুস পিতারূপে পূজিত, কারণ শুরু না হলে কিছুই শুরু হয় না।
(এখানে ভারতীয় ধারণার সঙ্গে আশ্চর্য মিল দেখা যায়— যেখানে কোনও শুভকাজ শুরু করার আগে দেবতার আশীর্বাদ প্রয়োজন)
জানুসের ছিল দুই মুখ—একটি অতীতের দিকে তাকানো, অন্যটি ভবিষ্যতের দিকে। তিনি দ্বার, রূপান্তর ও সন্ধিক্ষণের দেবতা। রোমানদের কাছে তিনি এক গভীর সত্যের প্রতীক ছিলেন: প্রতিটি নতুন শুরু আসলে এক ধরনের সমাপ্তিও বটে, প্রতিটি প্রবেশ মানেই কোনও না কোনও প্রস্থান। এই দর্শনের পরিব্যপ্তি ঘটে এই দেবতার মধ্য দিয়ে।
এই প্রতীক ছিল সুগভীর চিন্তাধারা ও সুন্দর— নতুন বছর মানে স্মৃতি আর সম্ভাবনার মাঝের দরজা। কিন্তু এখানে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে। প্রতীক ধীরে ধীরে আদেশে পরিণত হয়, ভাবনা হয়ে ওঠে কাঠামো। ১ জানুয়ারি কোনও জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা নয়। এটি কল্পিত, ধারণাভিত্তিক, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫৩ সালে রোম সিদ্ধান্ত নেয়—সেনাধ্যক্ষ ও প্রশাসনিক কর্তারা যেন আগেই দায়িত্ব নিতে পারেন, সেনা মোতায়েন ও প্রশাসনিক কাজ সহজ হয়। কর আদায় গুছিয়ে করা যায়— তাই বছরের শুরু স্থির হবে ১ জানুয়ারি। পরে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫ সালে জুলিয়াস সিজারের জুলিয়ান ক্যালেন্ডার এই ব্যবস্থাকে মান্যতা দেয়, আর ১৫৮২ সালে ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরি তা গাণিতিকভাবে সংশোধন করেন।
ইউরোপীয় সাম্রাজ্যগুলো যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তারা সঙ্গে করে নিয়ে যায় এই ক্যালেন্ডারও। এক সভ্যতার প্রশাসনিক সুবিধা ধীরে ধীরে গোটা মানবজাতির “সার্বজনীন সত্য” হয়ে ওঠে। প্রসঙ্গত, ১ জানুয়ারি আবিষ্কৃত হয়নি— এটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
রোম তার নববর্ষ ছড়িয়ে দেওয়ার বহু আগেই সভ্যতাগুলো সূর্যের গতি অনুযায়ী নিজেদের সময় নির্ধারণ করত। সেই প্রাচীন জ্ঞান আজও টিকে আছে ভারতীয় উপমহাদেশের নানা ক্যালেন্ডারে। এখানে নববর্ষ এক নয়, বহু রূপে আসে—
- বৈশাখী আসে পাঞ্জাবের সোনালি ফসল কাটার সময়, যখন কৃষক পরিশ্রমের পর উৎসবে মেতে ওঠেন।
- উগাড়ি ও গুড়ি পড়োয়া বসন্তের পুনর্জাগরণ চিহ্নিত করে, যখন প্রকৃতি নতুন প্রাণে ভরে ওঠে।
- পুথান্ডু সূর্যের মেষ রাশিতে প্রবেশকে মান্যতা দেয়— জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণে এটি নির্ভুল।
- চৈত্র প্রতিপদ চন্দ্র ও সৌর চক্রের ভারসাম্য রক্ষা করে।
- ওনাম কেরলের কৃষিভিত্তিক জীবনের কৃতজ্ঞতা ও সমৃদ্ধির উৎসব।
সবগুলোর ভেতরেই এক পুরনো ধারণা কাজ করে। সময় তখনই নতুন হয়, যখন জীবন নতুন হয়। প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে নয়, প্রকৃতির সাড়া পেলেই বছরের সূচনা।
১ জানুয়ারি কোনও চূড়ান্ত সত্য নয়, আবার নিছক কল্পনাও নয়। এটি রোমের রেখে যাওয়া এক উত্তরাধিকার— যার ভেতর দিয়েই আজ সমগ্র বিশ্ব একসঙ্গে হাঁটে। এটি হিসাবের খাতা খুলে দেয়, রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে, জটিল সমাজকে এক ছন্দে বেঁধে রাখে। তবু বহু সংস্কৃতি আজও তাদের নিজস্ব সময়চক্র আঁকড়ে আছে— যেখানে নববর্ষ ঋতুভিত্তিক, দেহে-মননে অনুভূত, ভূমি ও চর্চার সঙ্গে বাঁধা।
পুরনো ব্যবস্থার উত্তরাধিকারীরা মনে রেখেছে সেই সত্য, যা নুমা, রোম এবং গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার ধীরে ধীরে ভুলে গিয়েছিল— আসলে নবায়ন আসে ক্যালেন্ডারের পাতা উলটিয়ে নয়, পৃথিবীর নিজস্ব রূপ-ছন্দ-বৈচিত্র্যময়তা থেকে।









