বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিবেদন, কলকাতা:
রাজ্যে প্রশাসনিক পালাবদলের পর ২০২৬ সালের প্রথম দুর্গাপুজো ঘনিয়ে আসতেই রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে এক নতুন বিতর্ক। বিরোধী আসনে থাকাকালীন ক্লাবগুলিকে সরকারি কোষাগার থেকে দুর্গাপুজোর অনুদান দেওয়া এবং বিদ্যুতের বিলে ছাড় সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসার পরেই তিনি হাঁটলেন প্রায় একই পথে।
আরও পড়ুনঃ পুজোয় ১ লাখ টাকা অনুদানের ঘোষণা শুভেন্দুর! করলেন আবেদনও, অষ্টমীতে মদ বিক্রি বন্ধ
সোমবার মিলন মেলা প্রাঙ্গণে আয়োজিত দুর্গাপুজোর প্রশাসনিক ও সমন্বয় বৈঠক থেকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন, রাজ্যের আর্থিক সাহায্যপ্রার্থী ছোট ও মাঝারি পুজো কমিটিগুলিকে ১ লক্ষ টাকা করে সরকারি অনুদান দেওয়া হবে। শুধু তা-ই নয়, সিইএসসি (CESC) এবং রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন পর্ষদ (WBSEDCL) দুর্গাপুজোর বিদ্যুৎ বিল সম্পূর্ণ মকুব বা ১০০% ছাড় দেবে বলেও জানানো হয়েছে। এর পরেই রাজ্য রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন উঠেছে— “বিরোধীতাই কি তবে কেবল বিরোধী আসনে থাকার কৌশল ছিল?”
মমতা বনাম শুভেন্দু: পুজো নীতি ও রাজনীতির সমীকরণ
তৃণমূল জমানায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন দুর্গাপুজো কমিটিগুলির জন্য ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অনুদান এবং বিদ্যুৎ বিলে বড় অঙ্কের ছাড় ঘোষণা করতেন, তখন তৎকালীন বিজেপি নেতৃত্ব ও শুভেন্দু অধিকারী একে “সরকারি অর্থ ও রাজকোষের অপচয়” বলে দাগিয়ে দিতেন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ক্ষেত্রে ঝাড়াই বাছাই, ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রে দরাজ হস্তে টাকা বিলানো; মনএ হচ্ছে গন্তব্য এক রাস্তা একটু আলাদা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর রূপরেখা কেমন বদলালো, তা এক নজরে:
| বিষয় | সাবেক মমতা সরকারের নীতি | বর্তমান শুভেন্দু সরকারের নীতি |
| আর্থিক অনুদান | প্রতিটি নিবন্ধিত পুজো কমিটিকে ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা (২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী) নিশ্চিত অনুদান। | যোগ্য ও আবেদনকারী পুজো কমিটিগুলিকে ১ লক্ষ টাকা সরকারি অনুদান। তবে বড় পুজোকে না নেওয়ার অনুরোধ। |
| আবেদনের নিয়ম | সমস্ত নিবন্ধিত ক্লাব স্বয়ংক্রিয় বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় অনুদান পেত। | অনুদান সম্পূর্ণ ‘ঐচ্ছিক’ বা অপশনাল। বড় বাজেটের ক্লাবগুলোকে স্বেচ্ছায় সাহায্য না নেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। |
| বিদ্যুৎ বিলে ছাড় | পুজো কমিটিগুলির জন্য বিদ্যুতের খर्चे বড় ছাড় (প্রায় ৭৫-৮৫%) দেওয়া হতো। | রাজ্য বিদ্যুৎ পর্ষদ (WBSEDCL) ও প্রাইভেট সংস্থা (CESC) উভয়েই ১০০% বা নিখরচায় বিদ্যুৎ দেবে। |
আরও পড়ুনঃ ফের গড়াতে পারে ভারত-বাংলাদেশ ট্রেনের চাকা; আগামী মাস থেকেই চালু
CESC-র নীরবতা ও বিদ্যুৎ বিলে ছাড় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন
শুভেন্দু অধিকারীর এই ঘোষণার পর রাজনৈতিক মহল ও বিশেষজ্ঞ মহলে একগুচ্ছ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে:
-
সিইএসসি (CESC) কেন চুপ?
বেসরকারি বিদ্যুৎ সরবরাহকারী সংস্থা CESC সাধারণত তাদের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে দেয় না। যেখানে সাধারণ গ্রাহকের এক ইউনিট বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়, সেখানে দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে লক্ষ লক্ষ ইউনিট বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়ার সরকারি ঘোষণা মেনে নিয়ে তারা কেন নীরব ভূমিকা পালন করছে?
-
সাধারণ গ্রাহকের ঘাড়ে কি চাপ বাড়বে?
বেসরকারি সংস্থা বা রাজ্য বণ্টন পর্ষদ যে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাবে, তা পুষিয়ে নিতে পরবর্তী সময়ে সাধারণ মধ্যবিত্ত গ্রাহকের বিদ্যুৎ মাশুল (Tariff) বাড়িয়ে দেওয়া হবে না তো?
-
রাজকোষের স্বাস্থ্য বনাম রাজনৈতিক তোষণ:
যে বিজেপি নেতৃত্ব অতীতে অভিযোগ তুলত যে সরকারি টাকায় ক্লাব কেনাবেচা হচ্ছে, আজ সেই দলই ক্ষমতায় এসে ১ লক্ষ টাকার অনুদান দেওয়াকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবে? বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার জন্যই কি এই দ্বিমুখী অবস্থান?
রাজ্যের বহু সুশীল সমাজ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, বিরোধী আসনে থেকে যেসব সরকারি সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করা সহজ, ক্ষমতায় বসে সেই জনমোহিনী নীতি বা আবেগের স্রোত থেকে বেরিয়ে আসা যে কোনো রাজনৈতিক দলের জন্যই কঠিন। এখন দেখার, শুভেন্দু সরকারের এই সিদ্ধান্তকে জনগণ এবং বিরোধী শিবির কতখানি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে।


