বিশেষ সাংস্কৃতিক প্রতিবেদন:
“মানুষ মানুষের জন্য, একটু সহানুভূতি কি মানুষ পেতে পারে না?”—তাঁর বজ্রনির্ঘোষ অথচ দরদী কণ্ঠে এই এক অমর প্রশ্ন নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা মানবজাতিকে। তিনি কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন না, ছিলেন ব্রেনপুত্রের উথালপাথাল তরঙ্গকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দেওয়া এক যুগস্রষ্টা সাংস্কৃতিক কাণ্ডারী। আজ, ৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্ববরেণ্য সুরসাধক, ‘সুধাকণ্ঠ’ ভারতরত্ন ড. ভূপেন হাজারিকার জন্মদিবসে দেশজুড়ে তাঁকে জানানো হচ্ছে সশ্রদ্ধ প্রণাম ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।
১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর আসামের সাদিয়ায় জন্ম নেওয়া এই মহান শিল্পী নিজের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গানকে মানবমুক্তির ও সম্প্রীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে গেছেন।
আরও পড়ুনঃ বহুবিশ্বের অমলিন কণ্ঠস্বর আশা ভোঁসলে; শুভ জন্মদিনে এক সুরময় শ্রদ্ধার্ঘ্য
পদ্মা, গঙ্গা থেকে কলোরাডো: সীমাহীন সুরের ক্যানভাস
ভূপেন হাজারিকার সঙ্গীতজীবন কেবল কোনো নির্দিষ্ট রাজ্য বা ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ছিল না। আসামের লোকসুর ‘বিহু’ থেকে শুরু করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রভাব এবং পাশ্চাত্য ফোক গানের মেলবন্ধনে তিনি সৃষ্টি করেছিলেন এক সম্পূর্ণ নিজস্ব ধারা।
-
বাংলা ও বাঙালির হৃদয়ে অবস্থান: আসামের সন্তান হলেও বাঙালি সংস্কৃতিতে তাঁর অবস্থান ছিল অভিভাবকের মতো। ‘গঙ্গার বহমানতা’ নিয়ে লেখা “বিস্তীর্ণ দুপারে”, ‘আমায় একটা সাদা মেঘ দাও’, ‘দোলা হে দোলা’ বা ‘ও গঙ্গা তুমি বইছ কেন’—তাঁর গাওয়া একের পর এক বাংলা কালজয়ী গান বাঙালির আবেগ ও চেতনার সঙ্গে চিরতরে মিশে গেছে।
-
চলচ্চিত্র ও সমাজভাবনা: গণসংগীত থেকে শুরু করে মূলধারার চলচ্চিত্র—সবত্রই ছিল তাঁর অনায়াস বিচরণ। ‘রুদালী’, ‘এক পল’, ‘কালপুরুষ’-এর মতো চলচ্চিত্রে তাঁর সুরসংযোজন ভারতীয় চলচ্চিত্রে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল।
আরও পড়ুনঃ বাঘের আক্রমণে মর্মান্তিক পরিণতি, মৃত্যুর পরেও অঙ্গদানে অমর কুলতুলির মৎস্যজীবী আজিজ মোল্লা
সম্মাননা ও চিরন্তন উত্তরাধিকার
সঙ্গীত ও মানবতাবাদী ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ড. ভূপেন হাজারিকাকে দেশ ও বিদেশের একাধিক সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে:
| সম্মাননা / পুরস্কারের নাম | স্বীকৃতির বছর ও তাৎপর্য |
| পদ্মশ্রী ও পদ্মভূষণ | সংস্কৃতিতে অনন্য অবদানের জন্য যথাক্রমে ১৯৭৭ ও ২০০১ সালে প্রাপ্তি। |
| দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার | ১৯৯২ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রে তাঁর আজীবন অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান। |
| পদ্মবিভূষণ | ২০১২ সালে (মরণোত্তর) দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান। |
| ভারতরত্ন | ২০১৯ সালে (মরণোত্তর) ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘ভারতরত্ন’-এ ভূষিত করা হয়। |
তিনি বলতেন, “সঙ্গীতের কোনো ধর্ম হয় না, জাত হয় না। সঙ্গীত শুধুই মানুষের ভালোবাসার কথা বলে।” আজকের এই বিশেষ দিনে উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়-নদী পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সুরপ্রেমী পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন তাঁদের প্রিয় ‘সুধাকণ্ঠ’কে। তাঁর গান আজও বৈষম্য ও হিংসার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই করার আলো দেখায়।


