একসময় কেন্দ্রীয় বাজেট পেশের সময় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীকে লাল ব্রিফকেস নিয়ে সংসদে ঢুকতে দেখা যেত। ওই ব্রিফকেস নিয়ে দেশজুড়ে কৌতূহল থাকত। বাংলায় বিজেপি প্রথমবার সরকার গড়ার পর প্রথম বাজেট পেশ হবে। সোমবার বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। তাঁর পেশ করা বাজেটে কী থাকবে, তা নিয়ে কৌতূহল বাড়ছে। আশাও বাড়ছে বিভিন্ন ক্ষেত্রের। এরই মধ্যে আর একটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামিকাল বাজেটের পেপারগুলি যে ফাইলে ভরে অর্থমন্ত্রী বিধানসভায় ঢুকবেন, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ ১৫০ কোটির রেকর্ড গড়ল মমতার ‘চোর, তৃণমূল!
অর্থমন্ত্রী যে ফাইলে বাজেটের পেপার নিয়ে আসবেন, সেই ফাইলের কভার মাদুরকাঠি ও জুটের তৈরি। ফাইলের ডানদিকে উপরে অশোক স্তম্ভ রয়েছে। নিচে সত্যমেব জয়তে লেখা। মাদুরকাঠি ও জুটের তৈরি ফাইলের মাধ্যমে কি কোনও বার্তা দিতে চাইছেন নতুন অর্থমন্ত্রী? এই নিয়ে জল্পনা বাড়ছে।
বাজেটের ফাইলের অভিনবত্ব নিয়ে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিং বললেন, “আমাদের সমস্ত সরকারি কাজেই জুটের ফাইল ব্যবহার করা হয়। তবে এটা ঠিক, সোমবার জুটশিল্পে নিশ্চয় কোনও কোনও বড় ঘোষণা হতে পারে। কারণ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি সবসময় জুটকে গুরুত্ব দেন।”
আরও পড়ুনঃ এক দেশ এক নির্বাচনের ইঙ্গিত! ২০২৯-র প্রস্তুতি কমিশনের
প্রসঙ্গত, ২০২১ সাল থেকে সম্পূর্ণ পেপারলেস বা ডিজিটাল বাজেট পেশ হয় সংসদে। ডিজিটাল ট্যাবলেটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী।
বাংলায় প্রথমবার সরকার গঠন করেছে বিজেপি। আর প্রথমবার বাজেট পেশ করতে চলেছেন স্বপন দাশগুপ্ত। মার্চেন্ট চেম্বার অব কমার্সের আশা, নতুন বাজেটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ জোর দেওয়া হবে। উৎপাদন শিল্পের বিদ্যুৎ খরচ কমাতে ঘোষণার প্রত্যাশাও রয়েছে শিল্পমহলের। আগামিকালের বাজেটে শিল্প ও কর্মসংস্থানে জোর দেওয়া হতে পারে। আসতে পারে নতুন শিল্পনীতি। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। বৃহৎ বিনিয়োগ টানতে রাজ্যের শিল্পনীতিতে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১. ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের বোঝা থেকে মুক্তির রোডম্যাপ
অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত আগামী ৩ থেকে ৫ বছরের জন্য আর্থিক ঘাটতি কমানোর একটি মধ্যবর্তী ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করতে পারেন। অর্থ দফতরের অধীনে একটি বিশেষ ‘ডেট ম্যানেজমেন্ট সেল’ তৈরি করা হতে পারে, যার কাজ হবে পুরনো চড়া সুদের ঋণ পুনর্গঠন করা। তা ছাড়া সরকারি স্তরে অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক খরচ এবং অপচয় কমানোর একগুচ্ছ কঠোর নির্দেশিকা ঘোষণা করা হতে পারে বাজেটে।
২. কর না চাপিয়ে রোজগার বাড়ানোর কৌশল
- নতুন কর না চাপিয়ে রোজগার বাড়ানোর কৌশল নিতে পারে সরকার
- সাধারণ মানুষের উপর নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে রাজ্যের নিজস্ব আয় বাড়ানোর দিকেই সরকার ঝুঁকবে বলে মনে করা হচ্ছে।
- এতদিন বালি এবং অন্যান্য ছোট খনিজ সম্পদ থেকে বেআইনি সিন্ডিকেটের পকেটে যাওয়া রাজস্ব রুখতে এবার কঠোর নজরদারিতে স্বচ্ছ ই-নিলাম ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা হতে পারে।
- বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন সরকারি কলকারখানার অব্যবহৃত জমি এবং সরকারি ল্যান্ড ব্যাঙ্কের উদ্বৃত্ত জমি দীর্ঘমেয়াদি লিজে দিয়ে এককালীন বড় মূলধন সংগ্রহের নীতিও ঘোষিত হতে পারে বাজেটে।
- এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল নজরদারি এবং ই-ইনভয়েসিং প্রযুক্তির মাধ্যমে জিএসটি ফাঁকি রোখার কঠোর প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হতে পারে বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণায়।
৩. ভারী শিল্প, ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ও নতুন শিল্প করিডোর
নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বার্তা হতে চলেছে—‘অনুদান নয়, কর্মসংস্থান’। বাংলাকে ‘ইজ অব ডুইং বিজনেস’-এ প্রথম সারিতে আনতে ল্যান্ড ব্যাঙ্ক ও লাইসেন্স রাজের আমূল পরিবর্তন করা হতে পারে। শিল্পে বিনিয়োগ টানতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাটানোর স্পষ্ট দিশা থাকতে পারে বাজেটে। সে ক্ষেত্রে ‘সিঙ্গেল উইন্ডো’ ব্যবস্থা চালু হতে পারে।
এরই পাশাপাশি শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে ৪টি অঞ্চলকে ঘিরে বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করা হতে পারে—
- কলকাতা মেট্রোপলিটন অঞ্চল: লজিস্টিকস, আইটি এবং ফিন্যান্স হাব।
- দুর্গাপুর-আসানসোল অঞ্চল: ধাতু, ইঞ্জিনিয়ারিং ও ভারী শিল্প।
- হলদিয়া শিল্পাঞ্চল: পেট্রোকেমিক্যাল ও বন্দর-ভিত্তিক শিল্প।
- শিলিগুড়ি অর্থনৈতিক অঞ্চল: উত্তর-পূর্ব ভারত ও প্রতিবেশী দেশগুলির প্রবেশদ্বার হিসেবে গুদামজাতকরণ এবং রফতানি কেন্দ্র গড়ে তোলা।
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) এবং কৃষি
- বাংলার কর্মসংস্থানের বড় অংশই আসে এমএসএমই ক্ষেত্র থেকে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সুদে ভর্তুকি, সহজ ঋণ এবং সরকারি ক্রয়ে স্থানীয় শিল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো ঘোষণা থাকতে পারে।
- বিষ্ণুপুরের রেশম, মুর্শিদাবাদের কারুশিল্প, হাওড়ার ইঞ্জিনিয়ারিং, মালদহের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং নদিয়ার তাঁত শিল্পের জন্য বিশেষ ‘ক্লাস্টার ডেভেলপমেন্ট’ এবং সুদমুক্ত ঋণের জন্য ‘বেঙ্গল এমএসএমই গ্রোথ ফান্ড’ গড়া হতে পারে।
- কৃষকদের ফড়েদের হাত থেকে বাঁচাতে এবং ফলন নষ্ট হওয়া রুখতে কোল্ড স্টোরেজ চেইনে বড় ভর্তুকি ঘোষণা করা হতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বাংলার বুক কাঁপিয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা; ময়নাগুড়িতে ট্রেলারে ধাক্কা যাত্রীবোঝাই বাসের -
৫. থমকে থাকা কেন্দ্রের প্রকল্পে রেকর্ড বরাদ্দ (Capex Push)
- নতুন সরকার দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে কেন্দ্রের অর্থ টানার কৌশল নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার মতো যে প্রকল্পগুলি এতদিন থমকে বা নাম-বিতর্কে আটকে ছিল, সেগুলির জন্য রাজ্য-অংশের কোটি কোটি টাকা একলপ্তে বরাদ্দ করা হতে পারে।
- জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে সীমান্ত এলাকায় বিএসএফের কাঁটাতারের বেড়ার জন্য দ্রুত জমি অধিগ্রহণ এবং জেলা সংযোগকারী সড়ক ও সেতু মেরামতের জন্য বিশেষ তহবিল গড়া হতে পারে। কলকাতা মহানগর এলাকাতেও নিকাশি ও গণপরিবহণ উন্নয়নের জন্য বিশেষ প্যাকেজের সম্ভাবনা রয়েছে।
৬. কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়ন
- পিপিপি মডেলে আইটিআই আধুনিকীকরণের কথা ঘোষণা করা হতে পারে বাজেটে। টাটা, মারুতি বা এলঅ্যান্ডটি-র মতো বড় কর্পোরেট সংস্থার সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে রাজ্যের আইটিআই ও পলিটেকনিক কলেজগুলির খোলনলচে বদলে দেওয়ার পথে হাঁটতে পারে সরকার।
- যে সমস্ত স্থানীয় মাঝারি বা ছোট শিল্পসংস্থা বাংলার যুবকদের কাজে নিয়ে ট্রেনিং দেবে, তাদের স্টাইপেন্ড বা শিক্ষানবিশ নিয়োগের একটা অংশ রাজ্য সরকার সরাসরি আর্থিক ভর্তুকি হিসেবে বহন করতে পারে।
৭. উত্তরবঙ্গের জন্য ‘বিশেষ প্যাকেজ’
- নতুন সরকার উত্তরবঙ্গকে আলাদা অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিতে পারে। উত্তরবঙ্গের শহর ও গ্রামীণ এলাকায় ২৪ ঘণ্টা পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দিতে তিস্তা নদীর জলকে কাজে লাগিয়ে মেগা প্রোজেক্টের ঘোষণা হতে পারে।
- দার্জিলিং-কালিম্পং-ডুয়ার্সকে মিলিয়ে ইকো-ট্যুরিজম ও হোম-স্টের জন্য একগুচ্ছ কর ছাড় ও পর্যটন করিডোরের ঘোষণা সম্ভব।
৮. ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’ ও সমাজকল্যাণ সংস্কার
জনমানসে সবচেয়ে বড় কৌতূহল ছিল আগের জমানার ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পটির কী হবে। সরকার ইতিমধ্যেই তা স্পষ্ট করেছে। পুরনো প্রকল্পটির পরিবর্তে নতুন রূপ পাচ্ছে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’। যেখানে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী সমস্ত যোগ্য মহিলার জন্য সরাসরি আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ বাড়িয়ে মাসিক ৩,০০০ টাকা করা হয়েছে। শুধু অন্নপূর্ণা যোজনা নয়, সামাজিক প্রকল্প খাতে বছরে বিপুল আর্থিক দায় সামলাতে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী কিছু কঠোর ফিল্টারিং বা ছাঁটাইয়ের কথা ঘোষণা করতে পারেন।
আধার সংবলিত যাচাইকরণ ও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) ডেটার মাধ্যমে ইতিমধ্যেই প্রায় ২২ লক্ষ ভুয়ো বা অযোগ্য উপভোক্তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক অপচয় রুখতে আয়কর দাতা, সরকারি চাকুরিজীবী এবং পরিবারের কেউ প্রাতিষ্ঠানিক পেনশন পেলে তাঁদের এই প্রকল্পের আওতার বাইরে রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা ও আয়ের ঊর্ধ্বসীমা এই বাজেটে বেঁধে দেওয়া হতে পারে।
বিজেপি সরকারের এই প্রথম বাজেটের মূল সুর বা থিম হতে চলেছে—”ভাতা-নির্ভরতা থেকে সম্পদ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি” (From Welfare Dependency to Wealth Creation)। অর্থাৎ গরিবের কল্যাণ ও সামাজিক পরিকাঠামো যেমন চালু থাকবে, তেমনই রাজ্যকে স্বাবলম্বী করতে জোর দেওয়া হবে কলকারখানা ও পরিকাঠামোয়। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলার অর্থনীতির জন্য এটি কেবল একটি বাজেট নয়, বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক রোডম্যাপের প্রথম বড় পরীক্ষা।
- নতুন সরকার দিল্লির সঙ্গে সমন্বয় বাড়িয়ে কেন্দ্রের অর্থ টানার কৌশল নিতে পারে। প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, জল জীবন মিশন এবং প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার মতো যে প্রকল্পগুলি এতদিন থমকে বা নাম-বিতর্কে আটকে ছিল, সেগুলির জন্য রাজ্য-অংশের কোটি কোটি টাকা একলপ্তে বরাদ্দ করা হতে পারে।
- কলকাতা মেট্রোপলিটন অঞ্চল: লজিস্টিকস, আইটি এবং ফিন্যান্স হাব।


