সিঙ্গুর থেকে টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো প্রকল্প প্রত্যাহারের পর পশ্চিমবঙ্গের শিল্পায়নের যে দীর্ঘ স্থবিরতা শুরু হয়েছিল, তার অভিঘাত আজও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি রাজ্য। একসময় যে ন্যানো কারখানাকে ঘিরে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান এবং বিস্তৃত শিল্পাঞ্চল গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, রাজনৈতিক সংঘাতের জেরে সেই সম্ভাবনা ভেস্তে যায়। শিল্পপতিদের একাংশের মধ্যে বাংলার বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে অনাস্থাও তৈরি হয়েছিল।
তবে বর্তমান বিজেপি সরকারের দাবি, সেই পরিস্থিতি বদলানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। শুক্রবার আয়োজিত এক শিল্প ও বাণিজ্য সম্মেলনে বিভিন্ন বণিকসভা এবং শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে রাজ্যে প্রায় ১,৬০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। বণিকসভার সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘Bengal is back with a bang’, অর্থাৎ বাংলা আবার জোরালো প্রত্যাবর্তনের পথে।
অতীতের ভুল স্বীকার, শিল্পবান্ধব বার্তা
সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেন যে দীর্ঘদিন ধরে শিল্প ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাঁর কথায়, ‘আজকের বাংলায় সাধারণ মানুষ থেকে শিল্পপতি—সবারই কিছু না কিছু অভিযোগ রয়েছে। একসময় এই রাজ্য কার্যত একটি অখুশি রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে।’ তিনি আরও জানান, সরকার শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। তবে রাজ্যের প্রকৃত ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হবেন উদ্যোক্তারাই। তাঁদের সফলতাই বাংলাকে আবার শিল্পের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করবে।
আরও পড়ুনঃ ব্যান্ডেল স্টেশনের কাছে ট্রাফিক ব্লকের সিদ্ধান্ত! বাতিল এক ঝাঁক লোকাল ট্রেন
জমি সংক্রান্ত নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের অন্যতম দাবি ছিল জমি অধিগ্রহণ এবং শিল্পের জন্য জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনগত জটিলতা কমানো। সেই প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী জানান, ল্যান্ড সিলিং অ্যাক্ট আরও সহজ ও বাস্তবসম্মত করার বিষয়ে সরকার ইতিবাচকভাবে ভাবছে। শিল্পের প্রয়োজনে জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ হলে নতুন বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলেই আশা সরকারের।
বাঙালির ব্যবসায়িক দক্ষতার পক্ষে সওয়াল
সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আর্থিক উপদেষ্টা সঞ্জীব স্যান্যাল। তিনি বাঙালিদের ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণার তীব্র বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘বাঙালিরা ব্যবসা করতে পারে না—এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং বলা উচিত, বাঙালিরা ব্যবসা করতে চায় না। অথচ ব্যবসা করার ঐতিহ্য এবং সক্ষমতা বাঙালির রক্তেই রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, অতীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ভুল অর্থনৈতিক নীতির কারণে বাংলার ঐতিহ্যবাহী উদ্যোক্তা সংস্কৃতি অনেকটাই পিছিয়ে গিয়েছিল। সঠিক নীতি ও স্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হলে বাংলা আবার দেশের অন্যতম শিল্পকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগে আগ্রহ
রিপোর্ট অনুযায়ী, একাধিক শীর্ষ শিল্পসংস্থা পশ্চিমবঙ্গে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সবচেয়ে বড় ঘোষণা এসেছে হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস-এর তরফে। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুজোর আগেই প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বৃহৎ শিল্প প্রকল্প গড়ে তোলার কাজ শুরু হতে পারে। অন্যদিকে, এল অ্যান্ড টি রাজ্যে ৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি মেগা ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ২৫ হাজার সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এবং তথ্যপ্রযুক্তি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবায় এক হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
শুধু শিল্প নয়, স্বাস্থ্য পরিষেবাতেও বড় বিনিয়োগের ঘোষণা এসেছে। পিয়ারলেস গ্রুপ অফ হসপিটালস জানিয়েছে, তারা পশ্চিমবঙ্গে মোট ১,০০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এই বিনিয়োগের মধ্যে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে অত্যাধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা পরিষেবা সম্প্রসারণে। ১৫০ কোটি টাকা খরচ করা হবে বারাসতে একটি হাসপাতালের আধুনিকীকরণে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে আবাসন এবং শপিং মল নির্মাণে আরও ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ আরও বিপাকে অভিষেক, এবার নদিয়ায় খাস জমি দখলের অভিযোগ
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পেও আগ্রহ
রাজ্য বাজেটে সম্প্রতি ঘোষিত সেমিকন্ডাক্টর শিল্পনীতি নিয়েও ইতিবাচক সাড়া মিলেছে। আন্তর্জাতিক পরামর্শদাতা সংস্থা পিডাব্লুসি এই খাতে সরকারের সঙ্গে অংশীদার হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ফলে ভবিষ্যতে উচ্চপ্রযুক্তি শিল্প এবং ইলেকট্রনিক্স উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের সম্ভাবনা আরও উজ্জ্বল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্পোন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা?
নতুন সরকারের দাবি, অতীতের রাজনৈতিক সংঘাত ও শিল্পবিরোধী ভাবমূর্তি কাটিয়ে পশ্চিমবঙ্গকে আবার বিনিয়োগবান্ধব রাজ্যে পরিণত করার লক্ষ্যে ধারাবাহিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জমি নীতি সহজ করা, দ্রুত অনুমোদন, তথ্যপ্রযুক্তি, পেট্রোকেমিক্যাল, স্বাস্থ্য ও সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চ সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। যদিও এই ঘোষণাগুলির বাস্তবায়ন, প্রকল্পের সময়মতো কাজ শুরু এবং ঘোষিত কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি কতটা সফলভাবে পূরণ হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে শিল্পমহল ও সাধারণ মানুষের।


