শিবনাথ প্রধান, সাঁতরাগাছি, হাওড়া:
ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন, ঘূর্ণাবর্ত বা নিন্মচাপ যাই বলি না কেন ভারত সহ বাংলাদেশ, মায়ানমার, পাকিস্তান, ওমান সমুদ্র উপকূল প্রভাবিত হয় এই সব দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি । এমন কেন হয় তার দিকে একটু চোখ রাখি –
দুর্যোগের সৃষ্টি হয় সাইক্লোনে, কিন্তু এটি আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা পৃথিবীতে তাপের ভারসাম্য রক্ষা করে। গড়ে পৃথিবীতে প্রতি বছর প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়, কিন্তু যে অল্প সংখ্যক উপকূলে আঘাত হানে তা অনেক সময় ভয়াবহ ক্ষতি সাধন করে।
আরও পড়ুনঃ কপাল খুলবে, লটারি কাটুন; শনি ঠাকুরের আশীর্বাদ থাকবে ৩ রাশিতে
ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য সমুদ্রের জলের তাপমাত্রা কমপক্ষে ২৬-২৭ ডিগ্রী সেলসিয়াস থাকা আবশ্যক এবং একটি নির্দিষ্ট গভীরতা(কমপক্ষে ৫০ মিটার)পর্যন্ত এ তাপমাত্রা থাকতে হয়। এজন্য আমরা দেখি সাধারণত কর্কট ও মকর ক্রান্তিরেখার কাছাকাছি সমুদ্র গুলিতে গ্রীষ্মকালে বা গ্রীষ্মের শেষে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়। অন্য কোথাও বিশেষ হয় না।
সাম্প্রতিক সময়ে বিজ্ঞানীরা অনেকে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বৈশ্বিক উষ্ণায়নকে দায়ী করেছেন। ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রের তাপমাত্রা ১৯৭০ সালের পর প্রায় এক ডিগ্রী ফারেনহাইট বৃদ্ধি পেয়েছে। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই এক ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে এখন আগের চেয়ে শক্তিশালী এবং বেশি সংখ্যায় ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে সেই উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছেন আবহবিজ্ঞানীরা। আইএমডি-র রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, শুধু সমুদ্রপৃষ্ঠই নয়, ভূপৃষ্ঠের বায়ুর উষ্ণতাও (ল্যান্ড সারফেসে এয়ার টেম্পারেচার) ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। যে কারণে ২০০৯-২০১৯, এই এগারো বছরের মধ্যে ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭— পরপর এই তিন বছর ছিল উষ্ণতম। আর গত দু’দশক, অর্থাৎ ২০০১-’১০ এবং ২০১০-’১৯ ছিল সব চেয়ে উষ্ণতম (ওয়ার্মেস্ট এভার)।

আগে বঙ্গোপসাগরের তুলনায় আরব সাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা ০.৫-১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড কম থাকত। কিন্তু বর্তমানে উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের সৌজন্যে সেই উষ্ণতা প্রায় বঙ্গোপসাগরের মতো হয়ে গিয়েছে। ফলে শুধু সমসংখ্যক ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়াই নয়, এমনও দেখা যাচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের তুলনায় আরব সাগরে তৈরি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের প্রাবল্য বেশি হচ্ছে।
উত্তর ভারত মহাসাগরীয় এলাকায় (বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগর) ঘূর্ণিঝড়প্রবণ হিসেবে কিছু বছর আগে পর্যন্ত ধরা হত বঙ্গোপসাগরকেই। কিন্তু ১১৭ বছরের রেকর্ড ভেঙে ২০১৯ সালে আরব সাগরে চার-চারটি অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ায় আবহবিজ্ঞানীরা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যান যে, ঘূর্ণিঝড় নিয়ে এত দিনের পুরনো তত্ত্ব আর খাটছে না।
আরও পড়ুনঃ ট্রাম্পের নয়া নির্দেশিকা! মধুমেহ, স্থূলত্ব থাকলে মার্কিন ভিসা নয়
মৌসম ভবনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আবহবিজ্ঞানীরা দেখেছিলেন, বছর ১৫ আগেও উত্তর মহাসাগরীয় এলাকায় বছরে গড়ে পাঁচটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হলে তার চারটিই হত বঙ্গোপসাগরে। একটি আরব সাগরে। কিন্তু কয়েক বছর হল তাতে পরিবর্তন হয়েছে। যে পরিবর্তনের প্রতিফলন ধরা পড়েছিল গত বছর কেন্দ্রীয় আবহবিজ্ঞান দফতর (ইন্ডিয়ান মেটিরিয়োলজিক্যাল ডিপার্টমেন্ট বা আইএমডি) প্রকাশিত দেশের জলবায়ু সংক্রান্ত রিপোর্টেও। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে যে আটটি ঘূর্ণিঝড় দেশে আছড়ে পড়েছিল, তার মধ্যে পাঁচটিই (চারটির প্রাবল্য অত্যধিক ছিল) তৈরি হয়েছিল আরব সাগরে। অতীতে এমন ঘটনা ঘটেছিল শুধু ১৯০২ সালে।
বর্তমানে সাগরের যা পরিস্থিতি ঘনঘন ঘূর্ণাবর্ত ও ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির উপযুক্ত পরিস্থিতি রয়েছে । অনুমান করা হচ্ছে যে এই পরিস্থিতি আগামী দশক পর্যন্ত স্থায়ী থাকবে । ফলে দূর্যোগের সম্ভাবনা ভারত, মায়ানমার, বাংলাদেশ জুড়ে বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।









