পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় তথা চূড়ান্ত দফার ভোটগ্রহণের আগে রাস্তাঘাট থেকে শুরু করে বাড়ির ড্রয়িংরুমে আপাতত সেই প্রশ্নটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশেষত প্রথম দফার নির্বাচনে ভোটদানের হার ৯৩.১৯ শতাংশে পৌঁছে যাওয়ার পরে দ্বিতীয় দফার ১৪২টি বিধানসভা আসনের ভোটাররা ধন্দে পড়ে গিয়েছেন যে হাওয়া কোনদিকে বইছে?
আরও পড়ুনঃ ‘তৃণমূল এত নিকৃষ্ট মানের ভোট চোর…’ কীভাবে ভোট হবে বলে দিলেন শুভেন্দু
তৃণমূলের হোম টার্ফে এবার ভোট
এবার হাওয়া কোনদিকে বইছে, সেটা বোঝা যাবে আগামী ৪ মে। কিন্তু এবার দ্বিতীয় দফায় যে ১৪২টি আসনে (উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, পূর্ব বর্ধমান, হুগলি, হাওড়া এবং নদিয়া) ভোট, সেখানে অতীতে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষেই হাওয়া বয়েছে। হাওয়া বয়েছে বললেও ভুল বলা হবে, নদিয়ার একাংশ (মতুয়া-অধ্যুষিত আসন) বাদ দিয়ে বেশিরভাগ জায়গাই আসলে তৃণমূলের দক্ষিণবঙ্গের গড়ের মধ্যে পড়ে – তৃণমূলের কাছে এটা ঘরের মাঠ।
বুধবার যে ১৪২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে, সেখানে বিজেপির আক্রমণাত্মক প্রচারের মধ্যেও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ১২৩টি আসনে জিতেছিল তৃণমূল। অর্থাৎ স্ট্রাইক রেট ছিল ৮৬.৬৬ শতাংশের মতো। বিজেপি জিতেছিল মাত্র ১৮টি আসনে। নওশাদ সিদ্দিকীর আইএসএফের ঝুলিতে একটি আসনে গিয়েছিল। আর এই সাতটি জেলায় দুর্দান্ত ফলাফলের সুবাদে তৃতীয়বারের জন্য নবান্ন দখল করেছিল তৃণমূল।
‘দক্ষিণবঙ্গের বাধা না পেরোলে নবান্নের পা রাখা যাবে না’
অর্থাৎ ব্যাপারটা খুব স্পষ্ট – দক্ষিণবঙ্গের বাধা না পেরোলে নবান্নের পথে পা রাখা যাবে না। এক তৃণমূল নেতা স্পষ্ট বলেছেন, ‘এই অংশটা চিরকালই আমাদের সবথেকে শক্তিশালী জায়গা ছিল। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এখানকার মানুষ আমাদের সঙ্গে ছিলেন। আমরা যদি এবারও এই অঞ্চলটা ধরে রাখতে পারি, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই থাকবে বাংলা।’ একইসুরে বিজেপি নেতা বলেছেন, ‘দক্ষিণবঙ্গে ফাটল না ধরিয়ে ক্ষমতা দখলের কোনও বিকল্প রুট নেই। উত্তর ২৪ পরগনা, কলকাতা এবং হাওড়া হল আসল যুদ্ধক্ষেত্র। সেখানেই পরিবর্তন হতে হবে।’
অনেক সুযোগ দিয়েছে তৃণমূল, কিন্তু ফারাক গড়তে পারে SIR
পরিবর্তনের জন্য বিজেপির হাতে অনেক সুযোগও আছে। ১৫ বছরের প্রতিষ্ঠান-বিরোধী হাওয়া, লাগামছাড়া দুর্নীতির অভিযোগ (নিয়োগ দুর্নীতি-সহ), নারীসুরক্ষার মতো বিষয়গুলি তৃণমূলের বিপক্ষে যেতে পারে। কিন্তু সব হিসাব ওলটপালট করে দিতে পারে এসআইআর (ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সমীক্ষা)।
এসআইআরের ফলে উত্তর ২৪ পরগনায় ১২.৬ লাখ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা খুইয়েছে ১০.৯১ লাখ ভোটার। কলকাতায় ৬.৯৭ লাখ, হাওড়ায় প্রায় ছয় লাখ, হুগলিতে ৪.৬৮ লাখ এবং নদিয়ায় প্রায় ৪.৮৫ লাখ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। শুধু তাই নয়, কমপক্ষে ২৫টি বিধানসভা আসনে পূর্ববর্তী জয়ের মার্জিনের থেকে বেশি নাম পড়েছে।
তৃণমূলের অভিযোগ, বেছে-বেছে সংখ্যালঘু, গরিব এবং পরিযায়ী বাংলাভাষী ভোটারদের নাম দেওয়া হয়েছে। নিশানা করা হয়েছে মতুয়াদেরও। পালটা বিজেপির দাবি, বছরের পর বছর ধরে অনুপ্রবেশকারী ও ভুয়ো ভোটারের নাম ভরতি ছিল বাংলার ভোটার তালিকায়। তাই তালিকা সাফ করা হয়েছে।
ভোটাররা শেষপর্যন্ত কোন দলের কথায় আস্থা রাখে, তার উপরে নির্বাচনের ফল নির্ভর করছে বলে বিশ্লেষকদের মতে। তাঁদের মতে, এসআইআর-আতঙ্ক যত বড় হয়ে দাঁড়াবে, তত লাভ হবে তৃণমূলের। এসআইআরের জন্য মুসলিম, মহিলা এবং মতুয়া (মতুয়া ক্ষতে প্রলেপ লাগানোর চেষ্টা করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী) ভোটাররা (তিন ‘এম’) যদি এককাট্টা হয়ে তৃণমূলকে ভোট দেয়, তাহলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিশ্চিত চতুর্থবারের মুখ্যমন্ত্রী হবেন। সেক্ষেত্রে আইএসএফ, বাম বা কংগ্রেসের মতো ফ্যাক্টর কোনও কাজই করবে না। আর নাহলে বিজেপির নবান্ন দখলের পথ অনেকটাই সাফ হয়ে যাবে।
কালবৈশাখী ওঠার আগে শান্তি?
শেষপর্যন্ত কী হবে, তা এখনও টের পাওয়া যাচ্ছে না। চারিদিকে অদ্ভূত নিঃস্তব্ধতা রয়েছে – ঠিক যেমন ঝড় বা কালবৈশাখী ওঠার আগে হয়, সেরকমই শান্তি বিরাজ করছে। এমনিতে আবহাওয়া অফিসের যা পূর্বাভাস, তাতে আজ বুধবার ওই সাতটি জেলায় কালবৈশাখীর সতর্কতা আছে। ভোটেও সেরকম কালবৈশাখী উঠছে কিনা, তার উত্তর মিলবে ৪ মে।


