চন্দন দাস, কলকাতা:
ভারতীয় উপমহাদেশে সাম্যবাদী (কমিউনিস্ট) ভাবধারা প্রচার, শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন সংঘটিত করা এবং মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূল রূপকার কমরেড মুজাফফর আহমেদ (কাকাবাবু)। ১৮৮৯ সালের ৫ আগস্ট অবিভক্ত বাংলার নোয়াখালী জেলার সন্দ্বীপে জন্ম নেওয়া এই মহান বিপ্লবীর ৯৭তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছে দেশের বামপন্থী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক মহল।
লেখক হতে কলকাতায় এসে শহরের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, নাবিক ও শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা তাঁকে বদলে দিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব, খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের আবহে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত (১৮ই ডিসেম্বর ১৯৭৩) তিনি মার্ক্সবাদী আদর্শের বিশ্বস্ত সৈনিক হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন।
আরও পড়ুনঃ ভারতের ইতিহাসে সফল গুজব! ২০০ বছর নয়, ১২৯ বছর ইংরেজরা ভারত শাসন করেছে
রাজনীতি, কাজী নজরুল ও প্রকাশনা ক্ষেত্রে অবদান
মুজাফফর আহমেদের রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক অবদান অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত:
-
দৈনিক ‘নব্যযুগ’ ও ‘ধূমকেতু’: বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলা দৈনিক ‘নব্যযুগ’ সম্পাদনা করেন। পরবর্তীতে ১৯২২ সালে নজরুলের ‘ধূমকেতু’ সাময়িকীতে শ্রমিক শ্রেণির সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবি নিয়ে একাধিক কালজয়ী প্রবন্ধ লেখেন।
-
‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’: মার্ক্সবাদী দর্শন ও আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রচার ঘটাতে ‘লাঙল’ (পরবর্তীতে ‘গণবাণী’) পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন।
-
পাবলিশিং হাউস ও প্রেস প্রতিষ্ঠা: দলীয় মুখপত্র ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব—এই বিশ্বাস থেকে তিনি ‘ন্যাশনাল বুক এজেন্সি’ (NBA) এবং ‘গণশক্তি প্রেস’ গড়ে তোলায় মূল ভূমিকা নেন। ‘জনযুদ্ধ’, ‘দৈনিক স্বাধীনতা’, ‘গণশক্তি’, ‘দেশহিতৈষী’, ‘নন্দন’ এবং ‘এক সাথী’র মতো গণমাধ্যম পরিচালনায় তিনি ছিলেন প্রধান নির্দেশক।
ব্রিটিশ শাসন ও কারাবরণ: ঐতিহাসিক ভূমিকা
ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার অপরাধে ব্রিটিশ সরকার ও স্বাধীন ভারত—উভয় সরকারের আমলেই তিনি মোট ২০ বছরেরও বেশি কারাদণ্ড এবং ৮ বছর আত্মগোপনে কাটান।
-
কানপুর ও মিরাট ষড়যন্ত্র মামলা: ব্রিটিশদের কড়া নজরদারি ও রেগুলেশন III-এর অধীনে বন্দি হওয়া সত্ত্বেও মুক্তি পেয়েই কানপুর কমিউনিস্ট সম্মেলনে যোগ দেন। বিখ্যাত মিরাট ষড়যন্ত্র মামলায় তিনি ছিলেন প্রধান অভিযুক্ত।
-
সংগ্রাম ও অনশন: নৈনি, দার্জিলিং, বর্ধমান ও ফরিদপুর কারাগারে নির্জন কারাবাসের সময়েও রাজনৈতিক বন্দিদের খবরের কাগজ ও চিঠি লেখার অধিকার আদায়ে দু’বার অনশন লড়াই চালান।
-
কিষাণ সভা ও এআইটিইউসি: সর্বভারতীয় ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (AITUC)-এর সহ-সভাপতি এবং সর্বভারতীয় কিষাণ সভা (AIKS) গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরও পড়ুনঃ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক, জলমগ্ন বানারহাট, আতঙ্কে বাসিন্দারা
যেভাবে নাম হলো ‘কাকাবাবু’
১৯৪০-এর দশকে যখন পার্টির কাজ বেআইনি ঘোষণা করা হয়, তখন গোপন কার্যালয়ে কাজ করার সময় ধরা পড়ার হাত থেকে বাঁচতে তিনি সহ-কমরেডদের ‘ভাগ্নে’ বলে ডাকতেন। সেখান থেকেই দলের ভেতরে ও বাইরে পরম শ্রদ্ধায় তিনি সমাদৃত হন ‘কাকাবাবু’ নামে।
আদর্শ ও জীবনদর্শন
মুজাফফর আহমেদ বিশ্বাস করতেন—যুবসমাজকে কৃষক ও শ্রমিকের সঙ্গে একাত্ম হতে হবে। ডানপন্থী সুবিধাবাদ এবং বামপন্থী গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব—উভয়ের বিরুদ্ধেই তিনি ছিলেন অনমনীয় লেনিনবাদী। জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এই মহান বিপ্লবীর জীবনগাথা উপমহাদেশের রাজনীতিতে এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা।


