বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি:
কমিউনিস্ট পার্টির এমন এক আজব সাংগঠনিক নিয়ম রয়েছে যেখানে পার্টির সাধারণ সম্পাদকের ইচ্ছাকে কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারে—যে নিয়মের জাঁতাকলে পড়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়া হয়নি জ্যোতি বসুর। কিন্তু ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাস এমন এক বঙ্গসন্তানকে চেনে, যিনি দলের সংবিধানকে নখদর্পণে রেখে খোদ কংগ্রেস সভাপতিকে পদচ্যুত করে এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিলেন। তিনি বীরভূমের কীর্ণাহারের সন্তান, ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়।
রাজনীতিতে পাঁচ দশকের দীর্ঘ পথ চলায় তিনি ছিলেন ভারতীয় রাজনীতি ও সংসদীয় গণতন্ত্রের ‘আলোকবর্তিকা’। মহাকাব্যের কর্ণের মতো তিনি যেন সরকারের ‘অর্জুন’ বা মধ্যমণি হতে পারেননি, কিন্তু তাঁর প্রজ্ঞা ও সিদ্ধান্ত দেশকে বারবার দিশা দেখিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের ‘ভালো’ নেতা খুঁজে পাওয়া নিয়ে BJP-কে কড়া সতর্কবার্তা RSS-র
রাজনীতিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়ের প্রধান মোড়সমূহ
-
বাংলা কংগ্রেস থেকে রাজ্যসভা (১৯৬৯): অজয় মুখোপাধ্যায়ের বাংলা কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে সিপিআই(এম)-এর সমর্থনে ১৯৬৯ সালে প্রথমবার রাজ্যসভায় যান বোলপুর কলেজের তদানীন্তন অধ্যাপক প্রণব মুখোপাধ্যায়। সংসদে তাঁর তথ্যভিত্তিক ভাষণ দ্রুত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নজর কাড়ে।
-
জরুরি অবস্থা ও আনুগত্য: সাতের দশকের শেষে জরুরি অবস্থা পরবর্তী তদন্ত কমিশনে হাজিরা দিয়েও ইন্দিরার প্রতি চরম আনুগত্য দেখান তিনি। মন্ত্রগুপ্তির শপথের কথা স্মরণ করিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের গোপনীয়তা বজায় রাখেন।
-
সীতাকান্ত/সীতারাম কেশরি পর্ব ও সোনিয়া গান্ধীর উত্থান (১৯৯৮): কংগ্রেস সভাপতি সীতারাম কেশরিকে সরিয়ে সোনিয়া গান্ধীকে দলের রাশ সঁপে দেওয়ার নেপথ্যে ছিল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মাস্টারস্ট্রোক। সংবিধান অনুযায়ী ওয়ার্কিং কমিটির ক্ষমতা প্রয়োগ করে কেশরিকে সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে সোনিয়া জমানার সূচনা ঘটান তিনি।
-
প্রধানমন্ত্রী পদ না-পাওয়া ও ‘সঙ্কটমোচক’: ১৯৮৪-তে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্বের মাশুল এবং ২০০৪-এ ইউপিএ জয়ী হওয়ার পর মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও, প্রতিরক্ষায়, অর্থ ও স্বরাষ্ট্র—সব সংকটকালে ইউপিএ সরকারের প্রধান ‘সঙ্কটমোচক’ ছিলেন প্রণবই। পরবর্তীতে ২০০৪ থেকে ১১২টি ক্যাবিনেট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি।
বাম নেতার স্মৃতিচারণ: রবীন দেবের জবানিতে প্রণব মুখোপাধ্যায়
প্রণব মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে তাঁর রাজনৈতিক স্মৃতি ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন বামপন্থী নেতা রবীন দেব:
১. প্রথম সাক্ষাৎ ও রাজ্যসভা পর্ব (১৯৬৯)
“১৯৬৯ সালে শিয়ালদহে সুকুমার রায়ের মাধ্যমে প্রমোদ দাশগুপ্তের (প্রমোদদা) ঘরে তৎকালীন বাংলা কংগ্রেসের নেতা ও বোলপুর কলেজের শিক্ষক প্রণববাবুর সঙ্গে পরিচয় হয়। সিপিএমের সমর্থনে তিনি রাজ্যসভায় গিয়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাৎই ছিল তাঁর জীবনের বড় বাঁকবদল।”
২. প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অসাধারণ গুণাবলী
“পরবর্তীকালে আমি যখন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য, তখন তিনি রাজ্যসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রার্থী। আমি বামপন্থীদের এজেন্ট আর সৌগত রায় তাঁর এজেন্ট। ফল ঘোষণার পর উনি আমাকে দেখে হেসে বলেছিলেন—‘রবীনবাবুকে চিনি, উনি আমার এলাকার প্রতিনিধি।’ ওঁর স্মৃতির তুলনা ছিল না। ভিয়েতনাম উৎসব থেকে শুরু করে মুখ্যসচেতকদের সম্মেলন—সংসদীয় গণতন্ত্রের সমস্ত খুঁটিনাটি তাঁর নখদর্পণে ছিল। ফাইল পড়তে পড়তেই অন্যের সাথে আলোচনা করার বিরল ক্ষমতা তাঁর ছিল।”
৩. নাগপুর সফর ও আক্ষেপ
“জরুরি অবস্থার সমর্থন এবং ২০১৮ সালে নাগপুরে আরএসএস-এর সদর দফতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যক্তিগতভাবে কষ্ট দিয়েছিল। বামপন্থীরা তাঁকে ২০১২ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে পূর্ণ সমর্থন করেছিল। কিন্তু বৈষম্য সত্ত্বেও ওঁর সঙ্গে মতব্লিই ছিল অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ। আজকের রাজনীতিতে সেই পারস্পরিক সম্মানের জায়গাটাই মিস করি।”
আরও পড়ুনঃ পাওয়া যাচ্ছে না বাস, চরম সমস্যায় নদিয়ার যাত্রীরা
জঙ্গিপুর থেকে লোকসভা যাত্রার ইতিহাস
১৯৬৯ থেকে ২০০৪ দীর্ঘ সময় সংসদীয় রাজনীতিতে থাকলেও লোকসভায় কোনোদিন সরাসরি জিতে যাওয়া হয়নি তাঁর। ২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর কেন্দ্র থেকে তাঁকে দাঁড় করানোর পেছনে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
-
নিজের জয়ের ব্যাপারে সংশয়: প্রণববাবু প্রথমে রাজি না হয়ে নিজের ভঙ্গিতে মুখস্থ বলে গিয়েছিলেন জঙ্গিপুরের ইতিহাস, ডেমোগ্রাফি ও সংখ্যালঘু সমীকরণ।
-
ঐতিহাসিক জয়: বীরভূমের ব্রাহ্মণ সন্তান হয়েও মুর্শিদাবাদের মানুষ তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করে প্রথমবার সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সাংসদ হিসেবে লোকসভায় পাঠায়।
সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
| বছর / সময়কাল | রাজনৈতিক পদ ও ঘটনা |
| ১৯৬৯ | সিপিআই(এম) সমর্থনে বাংলা কংগ্রেসের প্রার্থী হিসেবে রাজ্যসভায় প্রবেশ। |
| ১৯৮২ – ১৯৮৪ | ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভায় দেশের কনিষ্ঠতম অর্থমন্ত্রী। |
| ১৯৮৬ – ১৯৮৯ | কংগ্রেসের সাথে দূরত্ব তৈরির পর ‘রাষ্ট্রী সমাজবাদী কংগ্রেস’ গঠন, পরে পুনর্বাসন। |
| ১৯৯৮ | কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মাধ্যমে সীতারাম কেশরিকে পদচ্যুত করে সোনিয়া গান্ধীকে সভাপতি নির্বাচন। |
| ২০০৪ – ২০১২ | ইউপিএ সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা, অর্থ ও বিদেশ মন্ত্রকের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। |
| ২০১২ – ২০১৭ | ভারতের ১৩ তম রাষ্ট্রপতির পদ অলঙ্কৃতকরণ। |
বাঙালি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক পদ (রাইসিনা হিলস) অলঙ্কৃত করা প্রণব মুখোপাধ্যায় দলমত নির্বিশেষে ভারতীয় রাজনীতির চিরন্তন ‘পণ্ডিত’ ও অভিভাবক হিসেবে অমলিন থাকবেন।


