বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি:
আর্কটিক অঞ্চলের সমুদ্রতলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ব্যবস্থার ফাইবার-অপটিক কেবল দৃশ্যমান কোনো চিহ্ন না রেখে অচল করে দেওয়ার সম্ভাব্য প্রযুক্তি নিয়ে একটি গোপন মহড়া চালিয়েছে রাশিয়া। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে পশ্চিমা দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে।
নরওয়ের সভালবার্ড (Svalbard) দ্বীপপুঞ্জের কাছে রাশিয়ার বিশেষ গভীর সমুদ্রসংক্রান্ত ইউনিট ‘গুগি’ (GUGI)-র একটি অত্যাধুনিক সমুদ্রযান ব্যবহার করে এই অনুশীলন চালানো হয়। তবে আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, এই ঘটনায় কোনো কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং এটি বাস্তব কোনো হামলা ছিল না; বরং সম্ভাব্য কৌশলগত সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে এই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।
আরও পড়ুনঃ এবার আমেরিকাতেও ‘অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার’! ‘মাস্টারস্ট্রোক’ ট্রাম্পের
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পশ্চিমা যৌথ প্রতিরোধ
পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের বসন্তকালে ঘটে যাওয়া এই ঘটনার মূল রূপরেখা নিচে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় ও উপাদান | ঘটনা ও সামরিক মূল্যায়নের বিবরণ |
| মহড়ার স্থান | নরওয়ের কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ সংলগ্ন সমুদ্রতল। |
| জড়িত বাহিনী | রাশিয়ার গভীর সমুদ্র গবেষণা সংক্রান্ত প্রধান পরিদপ্তর বা ‘গুগি’ (GUGI)। |
| ন্যাটোর পদক্ষেপ | রুশ জলযানের গতিবিধি বুঝতে পেরে ব্রিটেন, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে সমুদ্রে বাধা সৃষ্টি করে, যার ফলে মহড়া অসম্পূর্ণ রেখেই রুশ যানটি স্থান ত্যাগ করে। |
| প্রযুক্তির বৈশিষ্ট্য | ঐতিহ্যগতভাবে কেবল কেটে না ফেলে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা, যার ফলে হামলার পর কোনো স্পষ্ট শারীরিক বা দৃশ্যমান প্রমাণ পাওয়া না যায়। |
আরও পড়ুনঃ এই না হলে পাকিস্তানে; শত্রু নয়, জলের হাহাকারে ট্যাঙ্কার দখলে নিজেদের মধ্যেই ‘রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধে’ লিপ্ত পাক জওয়ানরা! আহত ২২
সভালবার্ডের কেবলের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব
সভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জের এই যোগাযোগ পরিকাঠামো কেবল নরওয়ের জন্য নয়, বিশ্ব মহাকাশ গবেষণার জন্যও অত্যন্ত সংবেদনশীল:
-
স্যাটেলাইট ডেটা ট্রানজিট: প্রায় ১,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২,৭০০ মিটার গভীরতায় বিস্তৃত ফাইবার-অপটিক কেবল দুটির মাধ্যমে ‘স্ভালস্যাট’ (SvalSat)-এর বিপুল তথ্য আদান-প্রদান করা হয়।
-
নাসার যুক্ততা: স্ভালস্যাট হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন, যা যুক্তরাষ্ট্রের নাসা (NASA)-র ‘নিয়ার-স্পেস নেটওয়ার্ক’-এর সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত। ফলে এই পরিকাঠামো অচল হলে বৈশ্বিক উপগ্রহ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘গ্রে-জোন’ যুদ্ধ ও ন্যাটোর উদ্বেগ
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউরোপের ডিজিটাল ও জ্বালানি পরিকাঠামোর সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ তুঙ্গে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা এই ঘটনাকে ‘গ্রে-জোন ওয়ারফেয়ার’ (Grey-zone warfare) বা ছায়াযুদ্ধের নতুন কৌশল হিসেবে দেখছেন:
-
চিহ্নহীন নাশকতার ঝুঁকি: দৃশ্যমান কোনো ক্ষতির চিহ্ন না রেখে কেবল বিকল করতে পারলে হামলার দায় প্রতিপক্ষের ওপর সরাসরি চাপানো কঠিন হয়ে পড়ে, যা ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া জানানোকেও জটিল করবে।
-
ন্যাটোর আর্টিকেল ৫ পরীক্ষা: কিছু মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকের মতে, ন্যাটোর যৌথ সুরক্ষা প্রতিশ্রুতি (Article 5) সরাসরি ভাঙার ঝুঁকি না নিয়ে সংঘাতের নিম্ন সীমায় থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সহনশীলতা পরীক্ষা করার একটি উপায় হতে পারে এই রূপ কৌশল।
যদিও রয়টার্সের প্রতিবেদনে রাশিয়া কর্তৃক সশরীরে কোনো কেবল কাটার নিশ্চিত প্রমাণ দেওয়া হয়নি, তবুও এই ঘটনা আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর ন্যাটোর নজরদারি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।


