ঝাঁ চকচকে থিমের প্যান্ডেল, ডিস্কো লাইটের হিল্লোড় আর ডিজে বক্সের কানফাঁটা আওয়াজে যখন মেতে ওঠে শহর বা মফস্সলের দুর্গাপুজো, ঠিক সেই সময়েই লাল মাটির জেলা পুরুলিয়া কিংবা রাঢ় বাংলার কোনো এক অন্তফলের গ্রামে গেলে সময় যেন কয়েক দশক পিছিয়ে যায়। সেখানে রাজপ্রাসাদসম মণ্ডপ নেই, নেই কোনো কর্পোরেট স্পনসরের হোর্ডিং। মাটির দেওয়াল, মাথার ওপর খড়ের চাল আর তারই মাঝে একটিমাত্র একচালায় প্রতিমার সাজে বিরাজ করেন মা দুর্গা। চারপাশে কোনো কৃত্রিম জাঁকজমকের লহরী নেই, অথচ সেই সাদামাঠা মাটির ঘরেই ভক্তি, নিষ্ঠা আর অকৃত্রিম ভালোবাসায় মাকে বরণ করে নেওয়ার যে প্রস্তুতি চলে, তার তুলনা মেলা ভার।
আরও পড়ুনঃ অসুরও প্রণম্য! মায়ের পাদস্পর্শে অসুরের শরীরে দেবত্ব জাগে, শবের বুকে শিব জাগে; রুদ্রাবতার মহিষাসুর
শহরের কৃত্রিম আলোয় মোড়া প্যান্ডেলগুলিতে থিমের মারপ্যাঁচে চোখ ধাঁধিয়ে গেলেও, পুরুলিয়ার এই গ্রামীণ পুজোগুলির অন্দরে ঢুকলে অন্য এক শান্তি খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে বৈদ্যুতিক রোশনাইয়ের আধিক্য নেই; বরং সন্ধ্যার ঘনিয়ে আসা অন্ধকারে মাটির প্রদীপের সনিদ্র আলোয় বা কুপি বাতির flickering glow-তে যখন মা দুর্গার মুখখানি ভেসে ওঠে, সেই দৃশ্য ভক্তের মনকে এক অন্য জগতে নিয়ে যায়। মাটির গন্ধ মেশানো বাতাস, ধুনুচির ধোঁয়া আর কাঁসার ঘণ্টার ধ্বনিতে মুখরিত সেই ঘরগুলিতে আধুনিকতার কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল আদি ও অকৃত্রিম ভক্তি।
আরও পড়ুনঃ মাটির ঘরের স্নিগ্ধতা আর বনেদিয়ানার ছোঁয়া; সাগরদিঘির দত্ত বাড়ির দুর্গাপুজো
আজকের যান্ত্রিক ও ডিজিটাইজড যুগে এই গ্রামীণ পুজো গুলোর বেশিরভাগই হয়তো কালের নিয়মে হারিয়ে যাওয়ার পথে, তবুও পুরুলিয়া ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের বহু গ্রামে আজও এই ঐতিহ্য পরম যত্নে বেঁচে রয়েছে। পুজোর এই কটা দিন সেখানে জাত-ধর্ম বা আর্থিক ভেদাভেদ মুছে গিয়ে গোটা গ্রাম এক হয়ে যায়। প্রদীপের স্নিগ্ধ আলোয় মায়ের প্রতিমা দর্শন আর বাড়ির বড়দের হাতে তৈরি নাড়ু-মুড়কির প্রসাদ বিতরণের মাঝেই লুকিয়ে থাকে শারদোৎসবের আসল রহস্য। কারণ, কোটি টাকার বাজেট হয়তো চোখ ভরাতে পারে, কিন্তু বাঙালির আদি মনকে শান্তি দিতে পারে কেবল এই মাটির ঘরের নিবিড় নিস্তব্ধতা আর প্রদীপের আলোয় ঘেরা সেই চিরন্তন মাতৃরূপই।


