চৈত্র সংক্রান্তির আগের দিন গ্রামবাংলায় সর্বাধিক বেশি পরিচিত নীলষষ্ঠী নামে। অথচ পঞ্জিকা খুললে এ দিনটা আদৌ ষষ্ঠী দেখাচ্ছেনা। এমাসে অশোকষষ্ঠী তো কবেই হয়ে গেছে, আবার নীলষষ্ঠী এলোই কি করে?
ধাপে ধাপে বিষয়গুলো জানলে পরিষ্কার হবে। প্রথমেই প্রশ্ন আসবে নীল কি? না, সেই নীল চাষের নীল নয়, মহেশ্বর। তিনি উগ্র বিষ পান করে নীলকণ্ঠ নাম নিয়েছেন। অনেকেই মনে করেন সেই থেকে মহেশ্বর কে এখানে নীল বলা হচ্ছে। আর আজকের দিনে তার বিয়ে হবে, মায়ের সাথে।
মা বলতে এখানে আমরা বলবো তাকে নীলাবতী বা নীলচণ্ডিকা। লোকমুখে শুনবেন ইনি হলেন সেই সতী মাতা, যিনি দক্ষযজ্ঞে প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পুনরায় নীলধ্বজ রাজার গৃহে জন্মগ্রহণ করেন। লক্ষণীয় এই পার্বতী আর সতীর মাঝে লোককথা ঢুকিয়ে দিল নীলাবতীকে। আর নীল মহেশ্বরের সহিত আবার এনার বিবাহ হবে। এই সম্পূর্ণ বিবাহ অনুষ্ঠান আজকের নীলষষ্ঠীর প্রধান আকর্ষণ।
আরও পড়ুনঃ সন্তানের মঙ্গল কামনায় নীলষষ্ঠী; গাজন ও নীলষষ্ঠী পুজো
গ্রামবাংলায় নীল বলতে যদি মূর্তি আকারে প্রকাশ বুঝি, তাহলে দেখবো একটা নিম কাঠে তৈরি বিগ্রহ, লালু শালু জড়িয়ে আজ বিয়ের জন্য নিয়ে যাওয়া হবে নির্দিষ্ট স্থানে। বিশেষ পুজোও হবে। বরযাত্রী থাকবে। পালাগান থাকবে। তবে হ্যাঁ গতকাল রাতে হয়ে গেছে হাজরা পুজো। এটা কি?
এ হল বিবাহ উপলক্ষে অন্যান্য দেবদেবীদের নিমন্ত্রণ।
এই নীলষষ্ঠীর যে লোককথা তা বলে নীলের সাথে নীলাবতীর অতি ধুমধামে বিবাহ হয়। দুজনের একান্ত সময় যাপনে হঠাৎ নীলাবতী তার প্রিয় স্বামীকে সন্তুষ্ট করতে গান ধরতে চান। এইখানে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন আঙ্গিক পাবেন কথায়, যে যেভাবে সাজিয়েছেন। তো হল কি, ঐ গান ধরতে গিয়ে নীলাবতী মাছির রূপ নিলেন। সেই মাছি বাবার কাছে গিয়ে গুনগুন করলে বাবা অত কিছু না ভেবে তাকে সরিয়ে ফেললেন। আর মাছিও অন্য ফুলে বসে পড়ে, পরবর্তীতে ঐ ফুল নদীতে পড়ে যায়, সাথে মাছির সলিল সমাধি ঘটে। আবার বাবার – মায়ের পূর্ণ মিলন সম্ভব হলনা। মেয়ের পরিণতিতে পিতা নীলধ্বজও প্রাণ বিসর্জন দিলেন। এখনো পর্যন্ত যতবার এই অংশটি শুনি, আমার যথাযথ লাগেনা। কিন্তু ভাবতে হবে দিনশেষে এটা লোককথা, তাই এতে বিসদৃশ জিনিসপত্র থাকবেই।
এই নীল-নীলাবতীর বিবাহে কিন্তু আজকে দুঃখের সেই অর্থে জায়গা নেই। গাজন – চড়ক সময়ে এ এক উৎসব। ভূতেদের উদ্দেশ্যে শোল মাছ পোড়া, সন্ন্যাসীদের নিরামিষ ভোগ সবকিছুর ব্যবস্থা থাকে বিভিন্ন জায়গায়।
এই পর্যন্ত যতটা দেখলাম, এটার সাথে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ যোগ নেই। তবে অবশ্যই প্রত্যক্ষ যোগ আছে, সেই যোগসূত্র স্থাপন করছেন মা ষষ্ঠী স্বয়ং। শুক্লা ষষ্ঠী বিনাই তিনি প্রচার করেন এই মাহাত্ম্য।
এখন ক্যাপশনে দিয়েছি নীলষষ্ঠী ব্রতকথা, তো ব্রতকথা থাকবেই। এতটুকুতে মন যদি অধৈর্য্য না হয়, আসুন তাহলে শুনেই ফেলি।
যেরকম হয়, এক গ্রামে এক ব্রাহ্মণ দম্পতি আছেন। তারা সন্তানধারণ করতে চাইছেন। কিন্তু তা সফল হয়না। অথচ তারা ছিল ধর্মপ্রাণ। বহু ব্রত পালন করেও তাদের কোলে সন্তান আসেনা।
এখন দুজনেই সরযূ নদীর ধারে প্রাণ বিসর্জনে উদ্যত হলে, এক বৃদ্ধা তাদের আটকায় । সবটা শোনে।
তখন ঐ বৃদ্ধা তাদের বলে যে তাদের আচারে ত্রুটি না থাকলেও ঐ ব্রাহ্মণী অন্য শিশুদের কান্না ও অন্যান্য ক্রিয়াকলাপ দেখে সহ্য করতে পারতেন না। এর ফলে মা ষষ্ঠীর কৃপা তাদের লাভ হয়না।
এতক্ষণে তারা বুঝে গেল এই বৃদ্ধা সাধারণ বৃদ্ধা নয়, ইনি মা ষষ্ঠী। তখন মা আবির্ভূত হয়ে নীলষষ্ঠী ব্রতপালন করতে বলেন । এই ব্রত পালনে আবার তাদের সংসারে সন্তান আসে। সুস্থ সবল।
আর এভাবেই ছড়িয়ে যায় নীলমাহাত্ম। ছড়িয়ে দেন স্বয়ং মা ষষ্ঠী।
প্রধানত সাধারণ মানুষের জন্য এই ব্রত বলতে শিব আরাধনা, বাড়িতে শিবের আরাধনায় লাগবে বেলপাতা (মাস্ট) , এবার ধুতরো ফুল, আকন্দ মালা, নীলকণ্ঠ ফুল ইত্যাদিও ব্যবহার করা যায় সাথে থাকবে ফল। ব্রত পালনকালে বাবাকে ও মা ষষ্ঠীকে স্মরণ করে পালন করতে হয়। খুবই সহজ। আসলে বাবার আরাধনা জটিল নয়, তবে আগ্রহ আর ধৈর্য থাকা দরকার।
গ্রামবাংলায় আজকেও সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়েরা এই ব্রত করেন।উপোস থেকেও পালন করেন। ব্রত শেষ হয় সন্ধ্যায় নীলের কাছে বাতি দিয়ে।
এবার বাতি বলতে এখানে প্রদীপ। ঘিয়ের। তবে মোমবাতি ব্যবহার না করাই শ্রেয়।
দুটো জিনিস মনে রাখা দরকার – এই পুজো সন্তানের মঙ্গল কামনায় মায়েরা করেন- মেয়ে সন্তান ছেলে সন্তান ভাগ নেই।
আর দ্বিতীয় হল উপাচার সর্বস্ব আরাধনার পরিবর্তে নিজের বাড়িতে স্বল্প আয়োজনেও এই ব্রত পালন সম্ভব। আর পুরুষরাও নিজের মত বাবার আরাধনা করতে পারেন। তাই শুধুই মায়েদের একচেটিয়া আরাধনা নয় এটি।
সন্তানের মঙ্গল কামনা হোক, বা নিজেদের কোনো কামনা, যদি তা সৎ উদ্দেশ্যে হয়, আর আপনার ভক্তির যদি জোর থাকে, তাহলে বাবা তাকে ফেরাবেন না। অসাধ্য সাধন করতে পারেন মহেশ্বর এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, আশা করি আপনাদের অনেকেরও নেই।
আরও পড়ুনঃ “এই আদালতে অন্যায় টেকে না”; রাত বারোটার আদালত!
চেষ্টা করুন নিজের পুজো নিজের ঘরে করতে, এতে আপনার মনোযোগ নষ্ট হয়না, ভক্তিতে বাধা আসেনা। ব্রত শেষ করতে হয় সন্ধ্যায় বিশেষ মুহূর্তে দেবতার কাছে দীপদানের মাধ্যমে। এবারের ভালো যোগ সম্ভবত বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭:১৭
এই দীপ আসলে আমাদের জীবনের প্রতীক, সদা প্রজ্বলিত থাক। মায়ের সন্তানেরা ভালো থাক। সকলের কল্যাণ হোক বাবার কাছে এই প্রার্থনা।



