পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নজিরবিহীন নিরাপত্তা নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আগামী ২৩ এপ্রিল রাজ্যে হবে প্রথম দফার ভোটগ্রহণ। এই দফাকে নির্বিঘ্ন ও শান্তিপূর্ণ করতে নির্বাচন কমিশন যে নিরাপত্তার ছক সাজিয়েছে, তা আক্ষরিক অর্থেই নজিরবিহীন। অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট নিশ্চিত করতে কমিশন এবার রাজ্যে মোট ২,৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সূত্রের খবর, এবারের ভোটে রাজ্যে মোতায়েন করা হতে পারে। প্রায় ২০০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী (CAPF)। সংখ্যার হিসেবে যা প্রায় ২ লক্ষ নিরাপত্তাকর্মী— বাংলার নির্বাচনী ইতিহাসে যা কার্যত রেকর্ড।
আরও পড়ুনঃ ‘বজ্রআঁটুনি’ ২৯-এর যুদ্ধে কাশ্মীরের বুলেটপ্রুফ ‘মার্কসম্যান’ এখন ভোট বাংলায়
নির্বাচনকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ করতে এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই বিশাল বাহিনী মোতায়েনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে।
প্রথম দফার এই নির্বাচনে উত্তরবঙ্গ থেকে শুরু করে জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ জেলা থাকছে। উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার, কোচবিহার, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর এবং মালদায় ভোটগ্রহণ হবে। অন্যদিকে, দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ ছাড়াও জঙ্গলমহলের ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া এবং পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর ও পশ্চিম বর্ধমানেও একই দিনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
কমিশনের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, নিরাপত্তার নিরিখে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মুর্শিদাবাদ জেলাকে। এই জেলাটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। প্রশাসনিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে জেলাটিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে— মুর্শিদাবাদ পুলিস জেলা এবং জঙ্গিপুর পুলিস জেলা। এই দুই এলাকা মিলিয়ে মোট ৩১৬ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। এর মধ্যে মূল মুর্শিদাবাদে থাকবে ২৪০ কোম্পানি এবং জঙ্গিপুরে ৭৬ কোম্পানি বাহিনী।
নিরাপত্তার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর। এই জেলায় মোতায়েন করা হচ্ছে ২৭৩ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী। উল্লেখ্য, এই জেলাটি এবারের নির্বাচনের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু, কারণ এখানেই রয়েছে হেভিওয়েট নন্দীগ্রাম কেন্দ্র। শুভেন্দু অধিকারী বনাম তৃণমূল প্রার্থী পবিত্র করের লড়াইয়ের কারণে এই জেলাকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ সবচেয়ে বেশি। এছাড়া পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাতেও কড়া নিরাপত্তা থাকছে, সেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে ২৭১ কোম্পানি বাহিনী।
নির্বাচন কমিশন জেলাওয়ারী যে বাহিনীর হিসাব দিয়েছে, তা নিচে দেওয়া হল:
বাঁকুড়া: ১৯৩ কোম্পানি
বীরভূম: ১৭৬ কোম্পানি
মালদা: ১৭২ কোম্পানি
পুরুলিয়া: ১৫১ কোম্পানি
কোচবিহার: ১৪৬ কোম্পানি
দক্ষিণ দিনাজপুর: ৮৩ কোম্পানি
ঝাড়গ্রাম: ৭৪ কোম্পানি
এত বিপুল সংখ্যক বাহিনী মোতায়েনের মূল কারণ হলো ভোটারদের মনে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং যে কোনও ধরণের গোলমাল বা হিংসা রুখে দেওয়া। প্রতিটি বুথে এবং বুথের বাইরেও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া পাহারা থাকবে। স্পর্শকাতর জেলাগুলোতে রুট মার্চ বা টহলদারির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে।
কমিশনের এই পরিকল্পনা স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, ২৩ এপ্রিলের ভোটে অশান্তি রুখতে তারা কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয়। জঙ্গলমহলের মাওবাদী উপদ্রুত এলাকা থেকে শুরু করে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত মুর্শিদাবাদ বা বীরভূম— সর্বত্রই নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য দেওয়াল গড়তে চাইছে প্রশাসন। সব মিলিয়ে, রাজ্যবাসীর নজর এখন ২৩ এপ্রিলের দিকে, যেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নজরদারিতে নতুন সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপ সম্পন্ন হবে।
নিরাপত্তা বাহিনীতে একটি কোম্পানি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ইউনিট। গড়ে একটি কোম্পানিতে থাকে ৯০ থেকে ১০০ জন জওয়ান।
সেই হিসেবে—
১. ২০০০ কোম্পানি মানে প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার থেকে ২ লক্ষ জওয়ান
২. এই বাহিনীকে ভোটের সময় বিভিন্ন জেলায় ঘুরিয়ে ব্যবহার করা হবে।
৩. ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে প্রাক–নির্বাচন মোতায়েন, রুটমার্চ। ভোট ঘোষণার আগেই বাংলায় শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আগমন।
১ মার্চ থেকেই প্রায় ৪৮০ কোম্পানি CAPF রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পৌঁছে গিয়েছে।
তাদের কাজ—
১. স্পর্শকাতর এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ
২. বুথ ও এলাকা নিরাপত্তা পর্যালোচনা
৩. ভোটের আগে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ
এই বিশাল নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একাধিক আধাসামরিক বাহিনী থাকবে। যেমন—
CRPF (Central Reserve Police Force)
BSF (Border Security Force)
ITBP (Indo-Tibetan Border Police)
SSB (Sashastra Seema Bal)
CISF (Central Industrial Security Force)
ভোটের দিন বুথ পাহারা থেকে শুরু করে এলাকা টহল— সব ক্ষেত্রেই এদের মোতায়েন করা হবে।
আরও পড়ুনঃ বেপরোয়া গতি! অ্যাপ ক্যাবে ধাক্কা মেরে ফুটপাথে উঠল গাড়ি
নির্বাচন কমিশনের মতে, বড় বাহিনী মোতায়েনের লক্ষ্য মূলত দুইটি—
১. ভোটের সময় সম্ভাব্য হিংসা বা সংঘর্ষ আটকানো
২. ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করা
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সত্যিই ২০০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন হয়, তবে তা হবে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা মোতায়েন।
দুই দফার ভোটে এই বাহিনীকে বিভিন্ন জেলায় ঘুরিয়ে ব্যবহার করা হবে বলে মনে করা হচ্ছে। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি অঞ্চলগুলির মধ্যে Darjeeling-এ ৬১, Kalimpong-এ ২১, Jalpaiguri-এ ৯২ এবং Alipurduar-এ ৭৭ কোম্পানি বাহিনী রাখা হচ্ছে।
এদিকে উত্তর দিনাজপুর জেলাকেও ইসলামপুর ও রায়গঞ্জ—এই দুই পুলিস জেলায় ভাগ করে মোট ১৩২ কোম্পানি বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটে ৪৪ এবং আসানসোল-দুর্গাপুর কমিশনারেটে ১২৫ কোম্পানি বাহিনী থাকবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোটের আগে সব বাহিনী মোতায়েন সম্পূর্ণ করতে সোমবারের মধ্যেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রথম দফার ভোটকে ঘিরে রাজ্যজুড়ে ইতিমধ্যেই জোরকদমে নিরাপত্তা প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে।



