Tuesday, 23 June, 2026
23 June
HomeকলকাতাWB Budget: কোন গৌরী সেন ঢালাও ঘোষণার বাজেটে টাকা জোগাবে? গৌরী সেনের...

WB Budget: কোন গৌরী সেন ঢালাও ঘোষণার বাজেটে টাকা জোগাবে? গৌরী সেনের ঠিকানা এখনও স্পষ্ট নয় 

স্বপন দাশগুপ্তর বাজেটকে তাই আপাতত "ইনভেস্টমেন্ট ভিশন ডকুমেন্ট" বলা যায়, "ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি" নয়।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

সোমবার পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার তাদের প্রথম বাজেট ঘোষণা করেছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কারণ এই বাজেট তো শুধু আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শনেরও প্রথম ঝলক। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর  সরকার তথা অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যে বাজেট পেশ করেছেন, তা পড়লে বোঝা যায়—সরকার একদিকে শিল্পায়ন, পরিকাঠামো, লজিস্টিকস, নগরোন্নয়ন, পর্যটন ও কৃষি সংস্কারের বড় রূপরেখা দিতে চেয়েছে, অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রেও হাত গুটিয়ে নেয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই বাজেট কি সত্যিই পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ টানতে পারবে? আর এত প্রকল্পের টাকা যোগাবে কোন গৌরী সেন? 

বিস্তারিত আলোচনার আগে একটা পর্যবেক্ষণ শুরুতেই জানিয়ে দেওয়া ভাল। তৃণমূল জমানায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলতে শোনা গিয়েছে, “ট্রেড মিলে হাঁটতে হাঁটতেই বাজেট বানিয়েছি, আমি চললে আমার ব্রেনও চলে।” সেই তুলনায় শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রথম বাজেট রচনায় একটা সিরিয়াস চেষ্টা দেখা গিয়েছে। বাজেট প্রস্তুতের আগে নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ি এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সিতারমনের সঙ্গেও দেখা করেছিলেন স্বপন দাশগুপ্ত। সিটি ইকোনমিক রিজিওন, লজিটিক্স, শিল্প করিডর—ইত্যাদি বিষয়ের ভাবনা সেখান থেকেই এসে বলে অনেকের ধারণা। অর্থাৎ এই বাজেট যে কলকাতা ও দিল্লি—সন্মিলিত ব্রেইন স্টর্মিংয়ের ফল, তা বলা যেতেই পারে। 

এবার সরাসরি বাজেটের  প্রসঙ্গে আসা যাক। এই বাজেটের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক হল শিল্প ও পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করে একাধিক উচ্চাভিলাষী ঘোষণা। ইজ অব ডুয়িং বিজনেস, শিল্পের জন্য সিঙ্গল উইন্ডো, শিল্পাঞ্চলের পুনরুজ্জীবন, ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর, লজিস্টিক হাব, সিটি ইকোনমিক রিজিয়ন, গিগ ইকোনমি, এআই, সেমিকন্ডাক্টর, ডেটা সেন্টার, টেকনোলজি ট্যালেন্ট ফান্ড—সবই রয়েছে। এমনকি শিল্প বিনিয়োগের জন্য আলাদা ইনসেনটিভ পলিসি এবং ৫,০০০ কোটি টাকার তহবিলের কথাও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ দুর্গাপুর, আসানসোল ও শিলিগুড়িতে মেট্রো রেল পরিষেবা; বোবা হয়ে গেলো বিরোধীরা

শুনতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কিন্তু বিনিয়োগের বাস্তব জগতে ঘোষণার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিশ্বাসযোগ্যতা। গত দড়ে দশকে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল নীতির স্থবিরতা ও বাস্তবায়নের অভাব। জমি, আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক অনুমোদন, ট্রেড ইউনিয়ন সংস্কৃতি, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ—এই সব প্রশ্নে শিল্পমহলের আস্থা কমেছে। বিজেপি সরকারের প্রথম বাজেটে সেই আস্থা পুনর্গঠনের কথা বলা হয়েছে বটে। তবে এও ঠিক, শুধু ঘোষণা দিয়ে টাটা, আদানি, রিলায়েন্স বা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের টানা যায় না। বিনিয়োগকারীরা আগে দেখবেন—রাজ্যে শিল্প স্থাপনের প্রকৃত পরিবেশ কতটা বদলেছে।

আরও বড় প্রশ্ন অর্থের জোগান

বাজেটের শেষ অংশে সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে রাজ্যের ঋণের বোঝা বিপুল। রাজস্ব ঘাটতি ও আর্থিক ঘাটতি দুটোই থাকছে। রাজ্যের মোট ঋণ প্রায় ৮ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে সরকার নিজেই বাজেটে উল্লেখ করেছে।

এই অবস্থায় বাজেটে যে বিপুল সংখ্যক প্রকল্প ঘোষণা হয়েছে, তার মোট আর্থিক দায় কয়েক লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছতে পারে। শুধু শিল্প নয়—স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সেচ, সুন্দরবন উন্নয়ন, নদী অববাহিকা প্রকল্প, নতুন সেতু, রেল করিডর, পর্যটন সার্কিট, গ্রামীণ উন্নয়ন, নারী স্বনির্ভরতা, দক্ষতা উন্নয়ন, আবাসন—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নতুন বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে।

এখানেই আসে সেই চিরন্তন প্রশ্ন—টাকা কোথায়?

বাজেট পড়লে দেখা যায়, সরকারের ভরসা মূলত তিন জায়গায়। প্রথমত, কেন্দ্রীয় প্রকল্প ও কেন্দ্রের সহায়তা। দ্বিতীয়ত, বেসরকারি বিনিয়োগ তথা পিপিপি (PPP) মডেল। তৃতীয়ত, রাজস্ব বৃদ্ধি। কিন্তু রাজস্ব বৃদ্ধির নির্দিষ্ট রূপরেখা তুলনামূলকভাবে এই বাজেটে অস্পষ্ট। শিল্প এলে রাজস্ব বাড়বে—এটি দীর্ঘমেয়াদি ফল। কিন্তু আগামী দু-তিন বছরে বিপুল মূলধনী ব্যয়ের টাকা আসবে কোথা থেকে, তার স্পষ্ট উত্তর বাজেটে নেই। 

অনেকের মতে, তা করতে গেলে এই বাজেটেই কঠোর সংস্কার কাজে হাত দিতে হত। যেমন পুরসভা এলাকায় জল কর আদায় করা ইত্যাদি। কিন্তু প্রথম বাজেটে হয়তো সুচিন্তিত ভাবেই সেই কড়া দাওয়াইয়ের কথা বলা হয়নি।

বলা যেতে পারে, এটাই এই বাজেটের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব। সরকার একদিকে কল্যাণমূলক খরচ পুরোপুরি কমাতে চাইছে না, অন্যদিকে পরিকাঠামোতেও বড় বিনিয়োগ করতে চায়। অর্থনীতির ভাষায় একে বলা যায় “দ্বৈত উচ্চাকাঙ্ক্ষা”। কিন্তু রাজস্ব সীমিত হলে কোনও এক জায়গায় অগ্রাধিকার ঠিক করতেই হয়।

আরও পড়ুনঃ বাংলা ঢেকে যাবে আকাশপথে; কলকাতার কাছে আরও একটি এয়ারপোর্ট

স্বপন দাশগুপ্তর বাজেটকে তাই আপাতত “ইনভেস্টমেন্ট ভিশন ডকুমেন্ট” বলা যায়, “ইনভেস্টমেন্ট গ্যারান্টি” নয়। এতে ভবিষ্যতের পশ্চিমবঙ্গের একটি আকর্ষণীয় ছবি আঁকা হয়েছে—শিল্পাঞ্চল, ফ্রেট করিডর, ডেটা সেন্টার, পর্যটন সার্কিট, স্মার্ট কৃষি, আধুনিক শহর। কিন্তু সেই ছবির রং এখনও শুকোয়নি। কারণ বিনিয়োগ আসে বিশ্বাস থেকে, আর বিশ্বাস তৈরি হয় ধারাবাহিক নীতি, প্রশাসনিক সংস্কার ও প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

অর্থমন্ত্রী একটি নতুন অর্থনৈতিক কাহিনি লেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সেই কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র এখনও অনুপস্থিত—অর্থের উৎস।

শিল্পপতিরা তাই বাজেটের ভাষণ নয়, আগামী ১২ থেকে ২৪ মাসে সরকারের কাজ দেখবেন। জমি পাওয়া সহজ হচ্ছে কি? অনুমোদন দ্রুত হচ্ছে কি? আইনশৃঙ্খলা স্থিতিশীল কি? প্রকল্প বাস্তবে এগোচ্ছে কি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে বিনিয়োগ আসবে। না হলে এই বাজেটও পশ্চিমবঙ্গের বহু বাজেটের মতোই উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতির দলিল হয়ে থাকবে।

মোদ্দা কথা হল, এই বাজেট স্বপ্ন দেখিয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে যে গৌরী সেনের প্রয়োজন, তাঁর ঠিকানা এখনও স্পষ্ট নয়।

 

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন