Friday, 10 April, 2026
10 April
HomeকলকাতাWest Bengal: সরকার বদলালেও পাল্টাবে কি পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি?

West Bengal: সরকার বদলালেও পাল্টাবে কি পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি?

আমরা কি কেবল একটি 'পরিবর্তন' চেয়েছিলাম, নাকি একটি 'রূপান্তর'?

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

একটি রাজ্যের পরিচয় কি কেবল তার মানচিত্র, নাকি তার প্রশাসনিক মেরুদণ্ড?

প্রথমেই বলে দিই এই পোস্টটি কোনও চরমপন্থীদের জন্যে নয় তাই তারা এড়িয়ে চলবে কারণ বুঝবে না।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক আকাশে পরিবর্তনের হাওয়া বারবার বইলেও, মানুষের মনের মধ্যে একটি প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত—ক্ষমতার পালাবদল কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনে, নাকি কেবল শাসকের নামটাই পাল্টে যায়?

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে একদলীয় বা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার রাজনীতি এই রাজ্যে যে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তা নিরাময়ের জন্য কেবল ভোটের ফলাফল যথেষ্ট নয়। যেটা নিয়ে আমরা বারংবার বলার চেষ্টা করেছি।

এই প্রতিবেদনটি সেই অদৃশ্য দেওয়ালগুলোকে চেনার চেষ্টা করবে, যা একটি উন্নত ও স্বচ্ছ পশ্চিমবঙ্গ গড়ার পথে দীর্ঘস্থায়ী অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরও পড়ুনঃ মসনদে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা এখনও অমলিন; বাম বাড়লে রাম কমবে, একপেশে হবে না ছাব্বিশের লড়াই

আমলাতন্ত্রের জড়তা থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবাষ্প, এবং গণতন্ত্রের শেষ রক্ষাকবচ হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নীরবতা—সবকিছুই আজ এক গভীর তদন্তের দাবি রাখে।

পশ্চিমবঙ্গকে বদলাতে হলে আমলাতন্ত্রের ভোলবদল কেন সবচেয়ে বড় শর্ত, তা বুঝতে গেলে এই ব্যবস্থার শিকড়ে নজর দিতে হয়। ঐতিহাসিকভাবেই এই রাজ্যে আমলাতন্ত্র বা ‘ব্যুরোক্রেসি’ একটি স্বয়ংশাসিত দ্বীপের মতো কাজ করে।

ব্রিটিশ আমলের সেই আধিপত্যবাদী মানসিকতা আজও বজায় রয়েছে, যেখানে আমলারা নিজেদের জনগণের সেবক নয়, বরং হর্তাকর্তা বলে মনে করেন। লাল ফিতের ফাঁস বা ‘Red Tapism’ এখানে কেবল একটি প্রবাদ নয়, বরং প্রশাসনিক বাস্তব।

একটি সাধারণ সরকারি সার্টিফিকেটের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করা থেকে শুরু করে বড় কোনো শিল্প প্রকল্পের অনুমোদনে বছরের পর বছর সময় অতিবাহিত হওয়া—এই ধীরগতি রাজ্যের উন্নয়নকে পঙ্গু করে দিয়েছে।

কিন্তু সমস্যাটি কি কেবল গতির? গভীর তদন্ত করলে দেখা যায়, আমলাতন্ত্রের এই জড়তার পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক এক অশুভ আঁতাত।

আমলারা যখন নিরপেক্ষভাবে কাজ করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক আদর্শ বা স্বার্থের কাছে নতি স্বীকার করেন, তখন প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ধূলিসাৎ হয়। পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামোতে এমন এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যেখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক আনুগত্য।

ফলে, সরকার বদলে গেলেও যদি আমলারা একই থাকেন এবং তাদের কাজের ধরণ ও মানসিকতা না বদলায়, তবে দুর্নীতির উৎস মুখগুলো কখনোই বন্ধ হবে না। একটি আধুনিক রাজ্যের জন্য প্রয়োজন ‘ডিজিটাল গভর্ন্যান্স’ এবং আমলাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি ফাইলের মুভমেন্ট সাধারণ মানুষের নখদর্পণে থাকবে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো সেটা কি আদৌ হয়?

অনেকেই মনে করে যে বাম আমল এই রাজ্য থেকে চলে যায় শুধুমাত্র সিঙ্গুর বা নন্দীগ্রামের মতন আন্দোলনের জন্যে।

তবে যারা ভিতরের খবর জানে তারা এটা মানবে যে শেষ দিকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী প্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য মহাশয় এই আমলাদের বদলি করা থেকে শুরু করে শো কজ করা শুরু করেন। যার জেরে সেই আমলারা এক প্রকার ঘুরে যায়।

খেয়াল করে দেখবে যে এই নির্বাচনের আগেই বেশ কিছু আমলাদের আগেই সরিয়ে ফেলা হলো। সেটা কিন্তু রাজ্য সরকারের তরফ থেকে করা হয়নি।

করা হয়েছে?

হুমম। ঠিক ধরেছেন।

যাই হোক। পরের বিষয়টায় এবার আসি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিবর্তনটি হলো সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ। একসময় যে রাজ্য প্রগতিশীল চিন্তাধারা এবং ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য পরিচিত ছিল, আজ সেই রাজ্যের প্রতিটি অলিগলিতে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট বিভাজনের খেলা চলছে।

আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই বিপজ্জনক খেলায় অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই আজ ‘নির্বিকার’। যখন কোনো দল বিশেষ কোনো সম্প্রদায়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিজের ভোট ব্যাংক সুরক্ষিত করতে চায়, তখন অন্য দলগুলো তার পাল্টা মেরুকরণ শুরু করে।

এই দড়ি টানাটানির (টাগ অফ ওয়ার) খেলায় হার হয় সাধারণ মানুষের। বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি বা শিল্পের মতো মৌলিক ইস্যুগুলো তখন ব্যাকবেঞ্চে চলে যায়, আর সামনে চলে আসে মন্দির-মসজিদ বা ধর্মীয় আবেগের লড়াই।

এই ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয় ভিত্তিক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের সামাজিক সংহতিকে এমনভাবে নষ্ট করছে, যার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদী। রাজনৈতিক দলগুলো জানে যে, মানুষকে ধর্মের নামে আবেগপ্রবণ করে তোলা অনেক সহজ, কিন্তু তাদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা অনেক কঠিন কাজ।

এই সহজ পথের সন্ধানেই আজ পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি পথ হারিয়েছে। যদি সত্যিই রাজ্যকে বদলাতে হয়, তবে এই সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প বন্ধ করা জরুরি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যে দলগুলো এই মেরুকরণের ওপর ভিত্তি করে ক্ষমতায় টিকে আছে বা ক্ষমতায় আসতে চাইছে, তারা কি আদৌ এই ধারাটি বন্ধ করতে চাইবে?

আরও পড়ুনঃ আরজি কর মামলায় বড় নির্দেশ বিচারপতি মান্থার

বিশেষ করে যখন তারা চাকরি / কারখানার কথা পরে বলে আর সামনে রাখে ভাতার মতন প্রকল্পের কথা?

গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমত। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমরা বারবার দেখেছি ‘সংখ্যার আস্ফালন’।

যখন কোনো শাসক দল বিধানসভায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসে এবং বিরোধীরা নগণ্য কয়েকটি আসনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন গণতন্ত্র তার ভারসাম্য হারায়। গত কয়েক দশকে এই প্রবণতা পশ্চিমবঙ্গকে এক ধরণের ‘সংখ্যাগুরুতন্ত্র’ বা Majoritarianism-এর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিরোধীদের কণ্ঠস্বর যখন বিধানসভার ভেতরে বা বাইরে ক্ষীণ হয়ে আসে, তখন সরকার হয়ে ওঠে স্বৈরাচারী। কোনো নীতি বা বিল নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা বা সমালোচনা করার সুযোগ থাকে না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে আমলাতন্ত্রের ওপর—শাসক দল যখন জানে যে তাদের চ্যালেঞ্জ করার মতো কেউ নেই, তখন আমলারাও আইন-কানুনকে নিজেদের মতো করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করেন।

সাধারণ মানুষ যারা বিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী, তারা এক ধরণের ভয়ের সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করতে শুরু করেন। ক্ষমতার এই কেন্দ্রীকরণ কেবল দুর্নীতিকেই প্রশ্রয় দেয় না, বরং মানুষের মধ্যে এক ধরণের রাজনৈতিক উদাসীনতা তৈরি করে। মানুষ ভাবতে শুরু করে, ‘ভোট দিয়ে কী হবে, বদল তো আসবে না’। এই মানসিকতা গণতন্ত্রের জন্য ক্যানসারের মতো।

গণতন্ত্রে কেবল সরকার আর বিরোধী দল থাকলেই চলে না, প্রয়োজন কিছু স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান যা সংবিধানের সুরক্ষা দেবে। কিন্তু বর্তমান ভারতের প্রেক্ষাপটে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) থেকে শুরু করে ইডি, সিবিআই, ইনকাম ট্যাক্স, বিচারবিভাগ—সবকিছুর নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নের মুখে।

তদন্তে উঠে আসে এক ভয়াবহ চিত্র, যেখানে এই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ তাদের স্বাধীনতা হারাচ্ছে। বিচারপতি লোয়া-র রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাটি আজও বিচারব্যবস্থার অন্দরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের এক কালো ছায়া হিসেবে রয়ে গেছে।

যখন একজন উচ্চপদস্থ বিচারপতি একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মামলার শুনানির সময় হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন এবং সেই তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার ওপর থেকে আস্থা টলে যায়। একই পরিস্থিতি নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেও।

নির্বাচনের সময়সূচী নির্ধারণ থেকে শুরু করে আদর্শ আচরণবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে শাসক ও বিরোধী দলের প্রতি কমিশনের ভিন্ন আচরণ আজ আর কারো অজানা নয়। পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে, যেখানে ভোট মানেই প্রায়শই হিংসা, সেখানে নির্বাচন কমিশনের এই ‘আপোষকামী’ ভূমিকা অত্যন্ত উদ্বেগের। যদি আদালতকে নীরব করে দেওয়া হয় এবং নির্বাচন কমিশন যদি নিরপেক্ষ আম্পায়ারের ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়, তবে কেবল ভোট দিয়ে সরকার বদলানো সম্ভব হলেও ‘ব্যবস্থা’ বদলানো অসম্ভব।

আর একটা কারণ এখানে জুড়ে দেওয়া যায় যে আজ যারা এই দলে আছে, আগামীকাল তারা ওই দলে চলে যাবে। তাহলে দিন শেষে পরিবর্তন কি আদৌ হয় নাকি শুধু রং বদল?

পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল গোলকধাঁধার মতো। এখানে সরকার বদলানো মানে কেবল ক্ষমতার হাতবদল নয়, বরং এটি একটি গভীর ব্যবস্থার সংস্কারের লড়াই হওয়া উচিত।

আমলাতন্ত্রের আধুনিকীকরণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, সাম্প্রদায়িক রাজনীতির চর্চাকে সামাজিকভাবে বয়কট করা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের দাবি তোলা—এগুলোই হওয়া উচিত আগামীর রাজনৈতিক এজেন্ডা।

শুধু ব্যালট বক্সে ছাপ দিয়ে পরিবর্তন আসবে না, পরিবর্তন আনতে হবে মানুষের চিন্তাধারায়। যখন সাধারণ মানুষ ধর্ম বা পরিচিতির ঊর্ধ্বে উঠে জবাবদিহিতা ও উন্নয়নের দাবিতে সরব হবে, তখনই হয়তো পশ্চিমবঙ্গ তথা দেশের আকাশে প্রকৃত বদলের সূর্য দেখা দেবে।

নচেৎ, শাসক বদলাবে, পতাকার রঙ বদলাবে, কিন্তু সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস আর প্রশাসনিক অন্ধকারের কোনো পরিবর্তন হবে না। প্রশ্নটা আজ আমাদের সবার কাছে—আমরা কি কেবল একটি ‘পরিবর্তন’ চেয়েছিলাম, নাকি একটি ‘রূপান্তর’? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে আমাদের ভবিষ্যৎ লড়াইয়ের ওপর আর সেটিং তত্বের উপর।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন