ধর্মের বিভেদ মুছে সোহার্দ্য ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনুপম নিদর্শন বহন করে চলেছে পূর্ব বর্ধমানের ভাতার থানার খুন্না গ্রাম। এই গ্রামে প্রায় দু’শো বছর ধরে উদযাপিত হয়ে আসছে মনসাদেবীর পুজো। জনশ্রুতি অনুযায়ী, এক মুসলিম পরিবারের হাত ধরে যে আরাধনার সূচনা হয়েছিল, আজও তাঁদের আনা প্রথম নৈবেদ্য গ্রহণের মাধ্যমেই শুরু হয় পুজোর মূল নিয়মকানুনের সূচনা।
আরও পড়ুনঃ ঐতিহ্যের ৫১৭ বছর, আকাশছোঁয়া উদ্দীপনা! বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির মনসা পুজোর রাজকীয় রীতি ও ইতিহাসের শিকড়
ইতিহাস ও কাজী পরিবারের ভূমিকা
গ্রামের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত একটি প্রাচীন বটগাছের নিচে পাথরের মূর্তিতে অধিষ্ঠিত দেবী মনসা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে তাঁকে ‘মা যমুনাগ’ নামেও ডাকেন।
-
দায়িত্ব হস্তান্তর: গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা অনুযায়ী, এই পুজোর সূচনা করেছিলেন গ্রামেরই সম্ভ্রান্ত ‘কাজী’ পরিবার। পরবর্তীকালে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব তুলে দেন প্রতিবেশী এক ব্রাহ্মণ পরিবারের হাতে।
-
অনন্য রীতি: দায়িত্ব হাতবদল হলেও দুই শতাব্দীর পুরনো নিয়মে কোনো ছেদ পড়েনি। নিয়ম অনুযায়ী, কাজী পরিবার থেকে নৈবেদ্য আসার পর তবেই মন্দিরে পুজোর কাজ শুরু হয়। এমনকি পুজোর হোমের পর প্রথম হোমের টিপও পরানো হয় এই কাজী পরিবারের সদস্যদের।
আরও পড়ুনঃ এই সর্পদেবী মনসা কে? মনসার জীবন সংগ্রামের ইতিহাস
মসজিদ ও দেবস্থানের সহাবস্থান
খুন্না গ্রামের এই মনসাতলার ঠিক গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে গ্রামের মসজিদটি। দেবীর থান এবং মসজিদের পাশাপাশি এই অবস্থান যেন গ্রামের চিরাচরিত সামাজিক মেলবন্ধনেরই প্রতিফলন।
প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের শেষ পঞ্চমী তিথিতে এই বার্ষিক পুজোকে ঘিরে পুরো গ্রাম উৎসবে মেতে ওঠে। কেবল খুন্না গ্রামের বাসিন্দারাই নন, পার্শ্ববর্তী মুসলিম প্রধান বানেশ্বরপুর থেকেও বহু মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই পুজো ও উৎসবে অংশ নেন।
পুরোহিত বীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী এবং স্থানীয় বাসিন্দা সিদ্ধেশ্বর মালিকদের ভাষায়, “আমরা বহু বছর ধরে হিন্দু-মুসলিম কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাশাপাশি বাস করে আসছি। আমাদের মধ্যে কোনও বিভেদ নেই, উৎসবও তাই সবার।” এই ঐতিহ্যই আজ প্রমাণ করে, ভক্তি ও বিশ্বাসের ঊর্ধ্বে সম্প্রীতির স্থান কতখানি অটুট।


