হিন্দু পৌরাণিক ঐতিহ্য অনুযায়ী দেবী মনসা হলেন সর্প ও নাগদের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সংহতি, জ্ঞান, উর্বরতা, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষার দেবী হিসেবে তিনি পূজিত হন। সংস্কৃত শব্দ ‘মানস’ (যার অর্থ মন) থেকে তাঁর নামের উৎপত্তি। বাংলায় বিশেষত বর্ষাকালে, যখন সাপের প্রাদুর্ভাব বাড়ে, তখন লোকদেবী হিসেবে তাঁর আরাধনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
আরও পড়ুনঃ পুজোর আগে রক্ষণাবেক্ষণ বিদ্যুৎ দফতরের; শিলিগুড়িতে সন্ধ্যার জল সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা
উৎপত্তি ও পারিবারিক পরিচয়
-
বংশপরিচয়: বিভিন্ন পুরাণে দেবীর জন্ম নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। তবে বাংলা লোকঐতিহ্য অনুযায়ী তিনি ভগবান শিবের কন্যা। নাগরাজ বাসুকি তাঁকে নিজের বোনের মতো স্নেহে লালন-পালন করেন।
-
স্বীকৃতির সংগ্রাম: স্বর্গীয় সংযোগ থাকা সত্ত্বেও শুরুতে দেবী হিসেবে সর্বজনীন স্বীকৃতি পাওয়া তাঁর জন্য কঠিন ছিল। সাপের উপস্থিতি ও ভয়ের কারণে অনেক দেব-দেবী ও মানবজাতি তাঁকে পুজো দিতে অস্বীকৃতি জানান।
-
পরিবার: ঋষি জরতকারুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় এবং তাঁদের সন্তানের নাম আস্তিক। এই আস্তিক মুনিই পরবর্তীতে রাজা জনমেজয়ের সর্পযজ্ঞ বন্ধ করে সমগ্র নাগকুলকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।
আরও পড়ুনঃ প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে; জলপাইগুড়ি জেলাজুড়েও মনসা পুজোর আমেজ তুঙ্গে
চাঁদ সওদাগর ও বেহুলার উপাখ্যান
বাংলা সাহিত্যের ‘মনসামঙ্গল কাব্য’-এর মূল ভিত্তি হলো চাঁদ সওদাগর, বেহুলা ও লখিন্দরের সঙ্গে দেবী মনসার দ্বন্দ্ব ও ভক্তির কাহিনী:
-
চাঁদ সওদাগরের প্রত্যাখ্যান: ধনকুবের চাঁদ সওদাগর ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তিনি দেবী মনসাকে পুজো দিতে অস্বীকার করলে দেবী রুষ্ট হয়ে চাঁদের বাণিজ্যতরী ডুবিয়ে দেন এবং সাপের দংশনে তাঁর ছয় পুত্রকে হত্যা করেন।
-
লখিন্দর হত্যা ও বেহুলার ভেলা যাত্রা: চাঁদের ছোট ছেলে লখিন্দরের বাসরঘরে লোহার বাসর ঘর বানিয়েও শেষরক্ষা হয়নি; মনসার পাঠানো কালনাগিনী তাঁকে দংশন করে। লখিন্দরের সতী স্ত্রী বেহুলা স্বামীর প্রাণ ফেরাতে কলার ভেলায় চড়ে স্বর্গের অভিমুখে ভেসে যান।
-
দেবতাদের সন্তুষ্টি ও মনসার জয়: স্বর্গে দেবসভায় নিজের অনন্য নৃত্য ও অসামান্য পতিভক্তি দিয়ে দেবতাদের তুষ্ট করেন বেহুলা। দেবতারা লখিন্দরসহ চাঁদের মৃত ছয় পুত্রকে জীবনদান করেন। এরপর চাঁদ সওদাগর অনিচ্ছাসত্ত্বেও বাম হাতে মনসা দেবীকে ফুল অর্পণ করে পুজো দেন এবং মর্ত্যে দেবীর স্থান সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
পূজাপদ্ধতি ও নাগ পঞ্চমী
নাগ পঞ্চমীতে এবং শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে দেবী মনসার বিশেষ আরাধনা করা হয়। বাংলায় কেবল প্রতিমাই নয়, মাটির মনসার ঘট, সিজ গাছ বা সাপের রূপ রূপকেও দেবীর প্রতীক হিসেবে পুজো করার রীতি রয়েছে।


