রাবণের সোনার লঙ্কা, শ্রীকৃষ্ণের সমুদ্রঘেরা দ্বারকা কিংবা দেবলোকের স্বর্গীয় প্রাসাদ ও দিব্য অস্ত্র—হিন্দু পুরাণের একাধিক কাহিনিতে কারিগরি ও স্থাপত্যের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে ভগবান বিশ্বকর্মার নাম। তিনি দেবতাদের স্থপতি এবং কারিগরদের আদি গুরু।
অথচ দেশে শিব, বিষ্ণু, দুর্গা, কালী বা গণেশের মতো বিশ্বকর্মার বড় ও বিখ্যাত মন্দিরের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। কেন এমন হলো? এর কি কোনো ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে, নাকি লুকিয়ে রয়েছে উপাসনার অন্য কোনো ধারা?
আরও পড়ুনঃ যন্ত্রের আরাধনা থেকে ঘুড়ি ওড়ানো; আজ উদযাপিত হচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারের পুজো
পুরাণের আলোয় বিশ্বকর্মা ও ‘ময়সভা’ বিতর্ক
ঋগ্বেদের ‘বিশ্বকর্মা-সূক্তে’ তাঁকে মহাজাগতিক সৃষ্টির প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। পরবর্তীকালে পুরাণে তিনি দেবতাদের মূল স্থপতি হিসেবে চিহ্নিত হন।
-
ঐতিহাসিক অবদান: লঙ্কাপুরী, কৃষ্ণক্ষেত্র দ্বারকা এবং দেবতাদের বিভিন্ন রথ ও অস্ত্র তাঁরই সৃষ্টি।
-
একটি ভুল ধারণা: অনেকেই মনে করেন পাণ্ডবদের ইন্দ্রপ্রস্থের বিখ্যাত সভাগৃহটি বিশ্বকর্মা তৈরি করেছিলেন। তবে মহাভারতের তথ্য অনুযায়ী, সেই অসাধারণ ‘ময়সভা’ নির্মাণ করেছিলেন ময়দানব, বিশ্বকর্মা নন।
মন্দির কম থাকার সম্ভাব্য কারণ ও উপাসনার স্বরূপ
অন্যান্য দেব-দেবীদের উপাসনা প্রধানত মন্দির, বিগ্রহ বা নির্দিষ্ট তীর্থক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বিশ্বকর্মা উপাসনার ধারাটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।
| বিষয়ের ক্ষেত্র | প্রচলিত প্রথা ও উপাসনার বৈশিষ্ট্য |
| কর্মস্থলই মূল মন্দির | কারখানা, লেদ মেশিন, গ্যারেজ, হাতুড়ি ও কাজের সরঞ্জামই পুজোর প্রধান কেন্দ্র হয়ে ওঠে। |
| শ্রমে দেবত্ব | মানুষের প্রতিদিনের কাজের সাথে দেবতার সম্পর্ক স্থাপনই এই পুজোর মূল বৈশিষ্ট্য। |
| ভৌগোলিক পরিধি | মন্দিরভিত্তিক আরাধনার চেয়ে কর্মশালা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পুজোই বেশি জনপ্রিয় ও সার্বজনীন। |
আরও পড়ুনঃ চোখ উঠল কপালে! পুরীর স্বর্গোদ্বারে ফেলা হল জগন্নাথ দেবের প্রিয় প্রসাদ কুইন্টাল কুইন্টাল খাজা
বিশ্বকর্মার উল্লেখযোগ্য মন্দির
বিশ্বকর্মার মন্দিরের সংখ্যা কম হলেও দেশে তাঁর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্দির রয়েছে:
-
গুয়াহাটি, অসম: নীলাচল পাহাড়ের পাদদেশে কামাখ্যা গেটের কাছে ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বকর্মা মন্দিরটি অত্যন্ত সুপরিচিত। প্রতিবছর পুজোর সময়ে এখানে বিপুল ভক্তসমাগম হয়।
-
অন্যান্য অঞ্চল: দেশের বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পাঞ্চল ও প্রাচীন শহরেও বিশ্বকর্মাকে উৎসর্গ করা বেশ কিছু মন্দির বিদ্যমান।
উপসংহার
বিশ্বকর্মা কেবল মন্দিরে বন্দি কোনো দেবতা নন; ভারতের কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের কাছে তিনি কাজের জায়গার জীবন্ত প্রতীক। যে হাত দিয়ে সৃষ্টি হয়, যে যন্ত্রে কাজ এগোয় এবং যে পরিশ্রমে কোনো নির্মাণ বাস্তব রূপ পায়—বিশ্বকর্মা পুজোর দিনে মূলত সেই শ্রম ও সৃষ্টিশীলতাকেই সম্মান জানানো হয়।


