আজকের ঝলমলে আলো, মাথায় মারাঠি পাগড়ি, ঢোল-তাসার উন্মাদনা কিংবা চুমকি-জড়ানো বিশালাকার গণপতির ভিড়ে যদি একটু অতীতমুখী হওয়া যায়, তবে দেখা যাবে বাঙালির ঘরের গণেশ ছিলেন একদম অন্যরকম। তিনি কোনো দূর দেশের মহাজাগতিক দেবতা নন—ছিলেন বাংলার রূপ-রস-গন্ধ মাখা সংসারেরই একজন সন্তান, উমার কোলে বসা কোলঘেঁষা ‘ঘরের ছেলে’।
সময় পরিবর্তনের নিয়মে সার্বজনীন উদযাপনের ব্যাপ্তি ও আড়ম্বর বাড়লেও, আধুনিক এই উৎসবের ভিড়ে ক্রমশ ম্লান হয়ে যাচ্ছে বাংলার নিজস্ব লোকায়ত ধর্মাচরণ, পাঁচালি, ব্রতকথা ও সাবেকি উমাপুত্রের রূপ।
আরও পড়ুনঃ বাসে উঠলেই ২০ টাকা! পুজোর পরেই বাসভাড়া বাড়তে পারে রাজ্যে
বাঙালির ঐতিহ্যিক গণেশ ও বর্তমান রূপের বৈসাদৃশ্য
বাংলার প্রথাগত গণেশ প্রতিমার রূপরেখা এবং আধুনিক সার্বজনীন উদযাপনের পার্থক্য নিচে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় ও ক্ষেত্র | বাংলার সাবেকি গণপতি | আধুনিক বাণিজ্যিক/আঞ্চলিক প্রভাব |
| প্রতিমার রূপ ও সাজ | শরীর জবার মতো টকটকে লাল, মাথা চাঁপার মতো শুভ্র; পরনে জোড় কাপড় ও পায়ে খড়ম। | বিশালাকার হলুদ বা বহু রঙের মূর্তি; মাথায় মারাঠি পাগড়ি ও চুমকি-জড়ানো সাজ। |
| মাথার শিরস্ত্রাণ | মাথায় ময়ূরপালক দেওয়া তারের চূড়া এবং সামনে মোমের পদ্ম ও শঙ্খ-চক্রের বিন্যাস। | ড্রাম, ঢোল-তাসা, আগমন শোভাযাত্রা ও বাণিজ্যিক আলো-ঝলমলে আড়ম্বর। |
| সাংস্কৃতিক ভূমিকা | বিজয়া ও নববর্ষের হালখাতার মঙ্গল প্রতীক; দুর্গাপুজোয় উমার জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং ‘ঘরের বড় নাতি’। | নিজস্ব আঞ্চলিক পরিচিতি ছাপিয়ে সর্বভারতীয় সার্বজনীন উৎসবের আকার। |
আরও পড়ুনঃ বিজেপির বাইক বাহিনীর তাণ্ডব! চন্দ্রকোনা রোডে সিপিএম অফিসে ভাঙচুর
হালখাতা, পৌরাণিক গাথা ও মাটির টান
বাঙালি বণিকের ঘরে গণেশের আরাধনা ছিল মূলত ব্যবসায়ের সমৃদ্ধি ও হালখাতার সূচনা ঘিরে। পরবর্তীতে রামায়ণ-মহাভারতের পাঠ ও পাঁচালির প্রভাবে অক্ষয় তৃতীয়া থেকে শুরু করে দুর্গোৎসবের ‘বিল্ববৃক্ষতলে’ আবাহন—সবকিছুতেই বাংলার মাটি ও লোকসংস্কৃতির এক গভীর আত্মিক টান জড়িয়ে ছিল।
কুমোরটুলি থেকে পাড়ার মোড়—আজ সর্বত্র দৃশ্যমান রূপান্তর। অন্যের উৎসব বা সংস্কৃতিকে গ্রহণ করায় আপত্তি না থাকলেও, সেই চাকচিক্যের মোহে নিজেদের আবহমান স্মৃতি, নিজস্ব রুচি এবং উমাপুত্রের চেনা রূপটি ধাপে ধাপে মুছে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন প্রবীণ ও সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালি।
উদ্যোজনের আলো ও রঙের মেলায় আজ চারপাশ ভরে উঠলেও, চোখের কোণে আজও অমলিন সেই লাল টুকটুকে, সাদা-মাথা, খড়ম-পরা, ময়ূরপালকের চূড়া-দেওয়া বাংলার নিজস্ব গণপতি—যাঁকে এককালে বাঙালি পরম আদরে নিজের ‘ঘরের ছেলে’ বলে চিনেছিল।


