কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষ করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের বিশ্বাস ও লোকায়ত ধর্মাচরণে এক অত্যন্ত চর্চিত ও প্রভাবশালী নাম ‘মাশান ঠাকুর’। শাস্ত্রীয় বা কুলীন দেবদেবী অপেক্ষা সাধারণ মানুষ নিজেদের দৈনন্দিন রোগব্যাধি ও আধিদৈবিক বিপদ থেকে আত্মরক্ষায় স্থানীয় এই লৌকিক অপদেবতার শরণাপন্ন হন।
শাস্ত্রীয় দেবদেবীর মতো সার্বিক মঙ্গলের পরিবর্তে মাশান ঠাকুরের মধ্যে অনিষ্ট করার আসুরিক ক্ষমতা রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। ফলে ভক্তি ও প্রবল ভীতির এক মিশ্র আবহেই যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই দেবতার আরাধনা।
আরও পড়ুনঃ শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য থেকে বেকম রোকেয়া; বদলে যাবে কলকাতার একাধিক রাস্তার সম্ভাব্য নাম
মাশান ঠাকুরের ১৮ রূপভেদ ও লোক অবস্থান
প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, নৃত্যরতা মা কালীর ঘর্মবিন্দু থেকে সৃষ্ট অগণিত মাশানের মধ্যে প্রধান ১৮ প্রকার রূপের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি নিচে তুলে ধরা হলো:
| মাশানের নাম | প্রধান অবস্থান ও লোকবিশ্বাস |
| পিছলা ও বহতা মাশান | নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের ধারে বসবাস। |
| বাড়িকা মাশান | বাড়ির পাশের বাগান বা বাঁশঝাড়ে অবস্থান; সামান্য বিচ্যুতিতে ভর করে। |
| ছুঁচিয়া ও ভুলা মাশান | ফাঁকা মাঠে অবস্থান; ভুলা মাশান পথিককে বিপথে চালিত করে। |
| চালান ও কুহুলিয়া মাশান | রাস্তার ধারের গাছে অবস্থান; কুহুলিয়া মাশান কোকিলের সুরে ডাক দেয়। |
| কালা ও কলির মাশান | কালা মাশানের স্থান শ্মশানে; কলির মাশান সর্বাধিক বলশালী ও সর্বব্যাপী। |
| নাঙ্গা মাশান | উলঙ্গ রূপ; এই মাশান ভর করলে মৃত্যু অবধারিত বলে বিশ্বাস। |
| অবুয়া ও জলুয়া মাশান | অবুয়া গর্ভবতী নারীদের আক্রমণ করে; জলুয়া মাশানের বাহন শোল মাছ। |
| শুকনা / হাওয়া মাশান | বাতাসে অবস্থান; ভর করলে রোগী ক্রমশ কৃশ বা শুকিয়ে যেতে থাকেন। |
| অঙ্গিয়া, এলিনা, চান্দিয়া, ড্যামসা, বিষুয়া | বহু রূপ ধারণ, স্বপ্নে আক্রমণ, মুণ্ডহীন নীল বর্ণ (বুকে চোখ), স্যাঁতসেঁতে জঙ্গল ও সর্বব্যাপী বিচরণ। |
আরও পড়ুনঃ গণেশ হারাননি; হারিয়ে গিয়েছি আমরা! মারাঠি গণপতির ভিড়ে হারিয়ে গেল বাংলার ঘরের ছেলে?
পূজাপদ্ধতি, ভৌগোলিক ব্যাপ্তি ও সুর-চিকিৎসা
মাশান ঠাকুরের পুজো শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; নেপাল, অসম, মেঘালয় এবং বাংলাদেশের কিছু জেলাতেও এর বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।
-
মূর্তির তারতম্য ও নৈবেদ্য: জলপাইগুড়িতে শোলা, কোচবিহারে মাটি এবং নেপালে মাটির ঢিবি বা ‘থাপানা’ রূপে তিনি পূজিত হন। নৈবেদ্য হিসেবে দই-চিঁড়ে, চালভাজার পাশাপাশি পোড়া চ্যাঙ মাছ নিবেদন করা হয়। সম্প্রতি তুফানগঞ্জে ১৮ হাতের মূর্তিতেও এর উদযাপন দেখা গেছে।
-
‘মিউজিক থেরাপি’ বা সুর-চিকিৎসা: লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, মাশান ‘ভর’ করলে বিশেষ মন্ত্রগান পরিবেশন করা হয়। এই লোকনাট্যভিত্তিক গান রোগীর মানসিক ও শারীরিক উপশমে একপ্রকার সংগীত-চিকিৎসা হিসেবে কাজ করে।
প্রকৃতির প্রতিকূলতা ও অজানা আশঙ্কার হাত থেকে বাঁচতেই গ্রামীণ মানুষ এই লৌকিক অপদেবতার আবাহন করে আসছে, যা আজ উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতির এক মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল।


