কিছু লৌকিক দেবতার কাহিনী
লৌকিক দেবতা গাজি পীর
গাজি পীর বাংলার লোককথা ও ধর্মীয় উপকথায় অন্যতম জনপ্রিয় এক পীর বা অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁকে সাধারণত একজন সুফি সাধক, শাসক, পশু ও প্রকৃতির রক্ষক এবং অলৌকিক শক্তিধর ব্যক্তি হিসেবে চিত্রিত করা হয়। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে, যা মূলত “গাজি কালু চম্পাবতী” কাব্যে বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
গাজি পীরের কিংবদন্তি ও বিশ্বাস : –
তাঁর বিশেষ শক্তি ছিল বলে জনশ্রুতি রয়েছে, যেমন বাঘ ও অন্যান্য বন্য প্রাণীরা তাঁর অনুগত ছিল।
বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত সুন্দরবন এলাকায় তাঁকে বনের রক্ষক হিসেবে সম্মান করা হয়।কিছু মতানুসারে, তিনি চিশতিয়া বা সুফি তরিকার অনুসারী ছিলেন।
গাজি পীর ও সুন্দরবন : –
গাজি পীরের নাম সুন্দরবনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে বাঘের উপদ্রবের বিরুদ্ধে মানুষের রক্ষাকারী হিসেবে তাঁকে সম্মান করা হয়। তাঁর প্রতি ভক্তি দেখিয়ে অনেক জেলে ও বনজীবী বনে যাওয়ার আগে গাজি পীরের উদ্দেশ্যে মানত করে।
গাজি পীরের উপাখ্যান : –
গাজি পীরের গল্পগুলো মূলত লোকগাথা ও কাব্যে পাওয়া যায়। বিশেষ করে “গাজি বিজয়” এবং “গাজি কালু চম্পাবতী” কাব্যে তাঁর অসাধারণ শক্তি ও ধর্মপ্রচারক রূপের বর্ণনা রয়েছে। এই কাব্যগুলো
মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কুমির দেবতা কালু রায়
কালু রায় হলেন বাংলার একজন লৌকিক দেবতা। সুন্দর বন অঞ্চলের লোকেরা কুমিরের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য কালু রায়ের পূজো করে থাকেন। ওখানকার কোনও কোনও মন্দিরে তিনি ব্যাঘ্র-দেবতা দক্ষিণরায় ও বনবিবির সাথে একসঙ্গে পূজিত হন। লোককাহিনী অনুসারে, স্থানীয় হিন্দুদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করতে গিয়ে বহু বার হিন্দু দেবদেবীদের সঙ্গে পীর বড়খাঁ গাজীর সংঘর্ষ তৈরি হয়। আঞ্চলিক প্রভুত্বের অধিকার নিয়ে বাঘ্র-দেবতা দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে বড়খাঁ গাজীর একবার প্রবল যুদ্ধ হয়েছিল। তাদের দুজনের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের জন্য কালু রায় বিশেষ ভূমিকা পালন করে ছিলেন। শেষে তাঁরা তিন জনে নিজেদের এলাকা ভাগ করে নেন।
দেবতা আটেশ্বর
সুন্দরবনের নানা লৌকিক দেবদেবীর মধ্যে অতি প্রাচীন এক দেবতা হলেন আটেশ্বর। তবে অতীতে তাঁর যথেষ্ট প্রাধান্য থাকলেও পরবর্তীকালে বনবিবি, দক্ষিণ রায় বা বড় খাঁ গাজীর তুলনায় প্রাধান্য হ্রাস পেয়েছে। আটেশ্বর হলেন মূলত গ্রামরক্ষক দেবতা। বনাকীর্ণ নিম্নবঙ্গ অঞ্চলের গ্রাম্য মানুষের কাছে তিনি অরণ্য রক্ষক ও গ্রামের পশুরক্ষক দেবতা হিসেবে পূজা পেয়ে থাকেন। এক সময় বনে প্রবেশের আগে মৌলে, বাউলে বা শিকারীরা আটেশ্বরকে পুজো দিত। কৃষকরাও ফসল ও গৃহপালিত পশুদের রক্ষার জন্য পুজো দিত। এই কারণে দুই ২৪ পরগনার নানা জায়গায় একসময় আটেশ্বরের থান তৈরি হয়েছিল। তবে সব থানে আটেশ্বরের মূর্তি নেই। অনেক জায়গায় তিনি প্রাচীন আরণ্যক সমাজের রীতিতে মাটির স্তূপ হিসেবে পূজিত হন।আবার মেদিনীপুরেও কাঁথি এলাকায় আটেশ্বরের উপস্থিতি দেখা যায়। অবশ্য এখানে তিনি অশরীরী অপদেবতা হিসেবে তাঁর অস্তিত্ব বজায় রেখেছেন। এখানে মানুষের বিশ্বাস আটেশ্বর গাছে থাকেন। এখানে যে গাছে আটেশ্বর আছেন বলে মানুষ বিশ্বাস করে সেই গাছকেই তারা পুজো করে। মানুষের বিশ্বাস, আটেশ্বর গ্রামেরই কোনও মানুষের রূপ ধারণ করে যার সাথে দেখা করেন তার মারাত্মক অসুখ হয়। এই বিশ্বাস অবশ্য উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় নেই। আটেশ্বরকে অঞ্চলভেদে ‘আট-মুনসি’ বা কেবল ‘আট’-ও বলা হয়।
ঢেলাই চন্ডী
ঢেলাই চন্ডী হলেন বাংলার এক লৌকিক দেবী। তিনি ‘ঢেলমারা দেবী’ বা ‘ঢেলহাই বাবা’ নামেও পরিচিত। এই পুজো আসলে এক রকমের বৃক্ষ পূজো। সাধারণত কোন খেজুর গাছ বা তেঁতুল গাছকে ঢেলাই চণ্ডী হিসেবে পূজো করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী, বহুবছর আগে একবার জমিতে ফসল হয়নি। সেইবার ঢেলাই চণ্ডী স্বপ্নাদেশ দেন যে, ঢেলা সাজিয়ে তাঁর পুজো দিলে চাষীরা ফসলের মুখ দেখবে। সেই থেকে এই পুজোর প্রচলন হয়। এই পুজোর নিয়মটা অদ্ভুত। নৈবেদ্য হিসেবে গাছের নিচে শুধু ঢিল ছুঁড়ে দেওয়া হয়। তবে অনেকেই দুধ ফলমূল পয়সাও নিবেদন করে থাকে। যেসব বাচ্চারা খুব কান্নাকাটি করে, ঢেলাই চণ্ডীর কাছে পূজো দিলে তাদের কান্না থেমে যায়। দেবী ঢেলাই চণ্ডী নদীয়া জেলায় খুব বিখ্যাত।
আরও পড়ুনঃ কলকাতার আকাশে সুজ্জিমামা উঁকি দিচ্ছে, টানা বৃষ্টি চলবে কলকাতা-সহ দক্ষিণে
কলেরার দেবী ওলাবিবি
ওলাইচণ্ডী বা ওলাদেবী হলেন বাংলার এক লৌকিক দেবী। মুসলমানদের কাছে ইনি ওলাবিবি নামে পরিচিত। লোকবিশ্বাস অনুসারে, ইনি ওলাউঠা অর্থাৎ কলেরা রোগের দেবী এবং দৈত্যরাজ ময়াসুরের পত্নী। কোথাও কোথাও দেবীকে তাঁর বাকি ছয় বোনের সাথে একসঙ্গে পূজো করা হয়। তাঁরা হলেন ঝোলাবিবি, আজগাইবিবি, চাঁদবিবি, বাহড়বিবি, ঝেটুনেবিবি ও আসানবিবি। আধুনিক গবেষকের মতে এই সাত বোন হলেনেন হিন্দুদের সপ্তমাতৃকারই রূপ। সপ্তমাতৃকাদের নাম গুলি হল, ব্রহ্মাণী, বৈষ্ণবী, মাহেশ্বরী, ইন্দ্রাণী, কৌমারী, বারাহী ও চামুণ্ডা। সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকেই ভারতে সপ্তমাতৃকার পুজো হয়ে আসছে। তবে দেবী ওলাইচণ্ডীর উৎপত্তি কিভাবে হলো তা নিয়ে সেরকম কোন ঐতিহাসিক নথি নেই। তবে ওলাবিবি নামটি এসেছে বিবির গান নামক একটি আখ্যান থেকে। এই আখ্যান অনুসারে, তিনি এক কুমারী মুসলমান রাজকন্যার সন্তান। তিনি অলৌকিক উপায়ে অদৃশ্য হয়ে যান এবং পরে দেবী রূপে আবির্ভূত হন। তাঁর আবির্ভাবের কারণ ছিল মানুষকে মহামারী থেকে মুক্তি দেওয়া।
বাঘ দেবতা দক্ষিণ রায়
জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। সুন্দরবনের মানুষদের কাছে এই প্রবাদ জীবন দিয়ে পাওয়া অভিজ্ঞতার সামিল। জীবিকার দায়ে যাদের গভীর অরণ্যে যেতে হয় তাদের মনে বাঘের তীক্ষ্ণ দাঁতের ভয় হওয়াই স্বাভাবিক। সেই ভয় থেকে মুক্তি পেতেই বাঘ-দেবতা দক্ষিণ রায়ের আবির্ভাব। আবার জনশ্রুতি অনুযায়ী, সুন্দরবনে দক্ষিণ রায় নামে রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন যিনি পরে লোকদেবতায় পরিণত হন।
দক্ষিণ রায়ের হরিদ্রাভ গায়ের রং, উজ্জ্বল গায়ের ত্বক, সারা গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ, বিরাট পাকানো গোঁফ, আর লম্বা একটি লেজ। সর্বদা তীর-ধনুক, ঢাল-তলোয়ার-বল্লম নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত তিনি। তবে লেজটি আসলে পোশাকের লেজ, তাঁর শরীরের লেজ নয়। পোড়া শোল মাছ, রান্না করা খাসির মাংস, মদ, গাঁজা, সিদ্ধি, তাড়ি দক্ষিণরায়ের নৈবেদ্য। দক্ষিণ রায়ের বাহন কোথাও বাঘ, কোথাও ঘোড়া। বারুইপুর থানার অন্তর্গত ধপধপি গ্রামেদক্ষিণ রায়ের মূর্তিটি এক সুপুরুষ রাজযোদ্ধার মতো, তাঁর হাতে বন্দুক, কোমরে তরবারি। মূর্তির পিছনে দেখা যায় তির-ধনুক, কুঠার, ঢাল ইত্যাদি অস্ত্র। সাদা ওড়না কাঁধে, সাদা ধুতি আর পায়ে নাগরা জুতো পরে দক্ষিণ রায় পূজিত হন। তবে মূলত দুই রকমের মূর্তি দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের একটিকে বলে দিব্যমূর্তি আর অন্যটি হল বারামূর্তি। বারামূর্তিতে একটি তিন কোণা মুকুট দেখা যায় দক্ষিণ রায়ের মাথায় আর চোখের টানা ভ্রু, টানা গোঁফ আর দু’ পাটি লম্বা লম্বা দাঁত মুখ থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। তাঁর পূজা মূলত মাঘ মাসে হয়ে থাকে। দিনের বেলায় পুজোর সময় লম্বা বাঁশের মাথায় আগুন জ্বেলে চারদিকে ঘোরানো হয়। লোকের বিশ্বাস যে সেই আগুন যতদূর পর্যন্ত দেখা যাবে ততদূর পর্যন্ত হিংস্র প্রাণী, ভূত-প্রেত, দৈত্য-দানব কেউই প্রবেশ করতে পারে না।
পাঁচু ঠাকুর
পাঁচু ঠাকুর শিশুসন্তান রক্ষক দেবতা। তিনি গর্ভস্থ শিশুকে রক্ষা করেন। শিশুদের ধনুষ্টংকার রোগ থেকে রক্ষা করেন। তাই প্রসূতি ও মায়েদের কাছে তিনি পরম আরাধ্য দেবতা। পাঁচু ঠাকুরের উদ্দেশ্যে ছাগ বলিরও রেওয়াজ আছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পাঁচু ঠাকুর মহাদেবের আরেক রূপ। কোথাও মাটির মূর্তিতে, কোথাও শিলা বা ঘটের প্রতীকে, কোথাও আবার শিলা রূপে হাতি ও ঘোড়া মূর্তিতে তিনি পূজিত হন। পাঁচু ঠাকুরের গায়ের রঙ লাল, তাঁর চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী। বড় গোলাকার রক্তাভ তিনটি চোখে রাগ। মূর্তিতে ঠাকুরের প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক বর্তমান, দাড়ি নেই, গোঁফ রয়েছে যা কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা । কানে ধুতরা ফুল গুঁজে রাখা। মূর্তির উর্ধাঙ্গ অনাবৃত, নিম্নাঙ্গে থাকে বাঘছাল, আবার কোনও কোনও জায়গায় নিম্নাঙ্গে কাপড় পরানো থাকে।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু, পায়ে খড়ম। পাশে থাকে পাঁচমুখো গাঁজার কলকে। পাঁচু ঠাকুরের আবার পরিষদ রয়েছে, তাঁর অনুচর হলেন লৌকিক দেবতা জ্বরাসুর ও ধনুষ্টংকার নামের দু’জন অপদেবতা। এঁর সঙ্গেই থাকে মামদো ভূত, ঘোড়া, বাঘ প্রভৃতি।







