বিশ্বজুড়ে খবরের জগতে যে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত বলে বিবেচিত হয়ে আসছে সেই বিবিসির দুই শীর্ষকর্তার পদত্যাগ ঘিরে সংবাদ জগতে শোরগোল শুরু হয়েছে। বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি এবং নিউজ বিভাগের প্রধান ডেবোরাহ টারনেস পদত্যাগ করেছেন। দু’জনে পৃথক বিবৃতিতে স্বীকার করেছেন, বিবিসি’র খবর পরিবেশনে সম্পাদকীয় নীতি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। তাই নৈতিক দায়িত্ব নিয়ে তাঁরা সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বিবিসির মতো একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর খবর প্রচারের অভিযোগ এবং তার জেরে দুই শীর্ষকর্তার পদত্যাগের ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সংবাদ মহলে তুমুল শোরগোল শুরু হয়েছে। মনে করা হচ্ছে এর জেরে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমগুলিও এবার চাপের মুখে পড়তে চলেছে।
আরও পড়ুনঃ মুখে হাঁসি, কিন্তু ‘ডেঞ্জারাস ম্যান’ ইউনূস! নোংরা খেলা খেলছেন, বললেন হাসিনার মন্ত্রী
বিবিসি’র বিরুদ্ধে একদিন আগেই সরব হন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। বিবিসি’র খবরকে ১০০ শতাংশ ‘ভুয়া’ এবং ‘অপপ্রচার যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ বিবিসি’র একটি তথ্যচিত্রে প্রেসিডেন্টের বক্তব্যকে এমনভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে যাতে মনে হচ্ছে, ক্যাপিটাল হিলের হিংসাত্মক ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্প উসকানি দিয়েছিলেন। ২০২১-এ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে ট্রাম্পের সমর্থকরা উত্তেজনাবশত ভাঙচুর চালায়। হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিটের বক্তব্য ওই ঘটনার সঙ্গে ট্রাম্পের কোনও সম্পর্ক ছিল না। তিনি কাউকে হিংসাত্মক কার্যক্রমে উৎসাহ দেননি। কিন্তু বিবিসির তথ্যচিত্রটি দেখে মনে হবে ওই ঘটনার সঙ্গে ট্রাম সম্পৃক্ত ছিলেন।
যদিও বিবিসি’র দুই শীর্ষকর্তার পদত্যাগের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিবের মন্তব্যের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। বিবিসি’র অভ্যন্তরেই সম্প্রতি খবর পরিবেশন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ উঠছিল। সংস্থার একাধিক সদস্য মনে করছিলেন সংবাদ পরিবেশনে সম্পাদকীয় নীতি এবং মান বজায় থাকছে না।
এরই মধ্যে ওই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের এডিটরিয়াল গাইডলাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস কমিটির প্রাক্তন পরামর্শদাতা মাইকেল প্রেসকট বিবিসি’কে মেল পাঠিয়ে পক্ষপাতিত্ব এবং নীতিভঙ্গের এই অভিযোগ তোলেন।
একই সময়ে ব্রিটিশ খবরের কাগজ দ্য টেলিগ্রাফ ট্রাম্পকে নিয়ে তথ্যচিত্রে তাঁর বক্তব্য বিকৃত করার অভিযোগ তোলে। বিভিন্ন সময়ের দুটি বক্তব্যকে জুড়ে তথ্যচিত্রে ব্যবহার করেছিল বিবিসি। দ্য টেলিগ্রাফের খবর ট্রাম্পের হাত আরও
শক্ত করে। জানা গিয়েছে, গাজার ঘটনাবলি এবং ট্রান্সজেন্ডার ইস্যুতে বিবিসি’র কভারেজ নিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠেছিল।
আরও পড়ুনঃ দূষণে দমবন্ধ, নিঃশ্বাসে বিষ; দিল্লিতে ক্লাউড সিডিংয়ের পরই কি বায়ু দূষণে বৃদ্ধি!
আন্তর্জাতিক এই সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে খবর পরিবেশনা নিয়ে অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন দেশ এই সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে নানা ইস্যুতে সরব হয়েছে। তিন বছর আগে গুজরাত দাঙ্গা নিয়ে তথ্যচিত্রে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে অন্যায় ভাবে দায়ী করার অভিযোগ ওঠে বিবিসির বিরুদ্ধে। ভারত সরকার তথ্যচিত্রটি দেশের পরিবেশনার অনুমতি দেয়নি। পরে আয়কর সংক্রান্ত বিবাদেও জড়ায় বিবিসি।
আবার কারগিল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান সরকার অভিযোগ করে বিবিসি একতরফা ভারতের হয়ে প্রচার চালাচ্ছে। বিবিসিকে ‘ভারত ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন’বলে বিদ্রুপ করে পাকিস্তান। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার আগে শেখ হাসিনার প্রশাসনও বিবিসির বিরুদ্ধে সরব হয়েছিল।
তবে এবারের অভিযোগ গুরুতর এবং বিবিসির মতো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কারও বক্তব্য বিকৃত করার অভিযোগ অভাবনীয়, অপ্রত্যাশিত বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। পদত্যাগপত্রেদুই শীর্ষকর্তাই অভিযোগ মেনে নিয়ে এর নৈতিক দায় নিয়েছেন। বলেছেন নৈতিক দায় নিয়ে সরে গেলাম। যদিও বিবিসি এখনও সরকারিভাবে পদত্যাগ নিয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেয়নি। প্রতিষ্ঠানের দুই শীর্ষকর্তার পদত্যাগের খবরও প্রকাশ করেনি ওই সংবাদমাধ্যম।









