দেবজিৎ মুখার্জি, কলকাতা:
গড়িয়াহাটে যাতায়াতটা বহু ছোট থেকে। অলিগলি এক্কেবারে ঘেঁটে ফেলা। আগে সিগন্যাল থেকে সোজা লেকে গিয়ে আড্ডা জমানো ছিল নেশা, পরে তা পাল্টে যায়। লেকের জলে হাওয়া খেলতে দেখা বা পাখিদের ঝগড়া, শিকার, ঘরে ফেরা দেখা ভাল লাগতে থাকে। আরও কিছুটা বয়স ও ব্যস্ততা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই গড়িয়াহাট চত্বরই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন। যখনই মন খারাপ হয়েছে, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির আশপাশ বা নবনীতা দেবসেনের বাড়ির সামনের রাস্তায় হেঁটেছি। কলকাতার পুরনো বাড়ি দেখেছি, লোকজন দেখেছি, ক্যাফে গড়ে উঠতে দেখেছি, তারাও আমায় দুহাত ভরে আপন করে নিয়েছে।
কম বয়সে আবেগ বোধহয় কম কাজ করে, তাই কত কী যে সেসময় এড়িয়ে গিয়েছি, পুরোপুরি না পারলেও এড়িয়ে গিয়েছি এটা বাস্তব। কিন্তু শেষ কয়েকবছর ধরে, বিশেষ করে করোনা প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার পর একটু বেশিই সবকিছু চোখে পড়ছে। ছোট ছোট জিনিসও চোখের আড়াল হয় না আজকাল।
আরও পড়ুনঃ SIR সংক্রান্ত ৬৫টি অভিযোগ তুলে কমিশনে শুভেন্দু
রাস্তায় চারপেয়েদের খেতে না পাওয়া মুখ থেকে চোখে না দেখতে পাওয়া মানুষটা বা ফ্যাকাসে মুখে লজ্জায় কফি হাউসের পাশে প্রেসকিপশন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহিলাদের আজকাল বড্ড বেশি চোখে পড়ছে। সেই চোখ দিয়েই দেখে ফেলেছিলাম হিন্দুস্তান পার্কে বিখ্যাত শাড়ি বিপণী সাহা টেক্সটাইলে ঢোকার আগে এই ভদ্রলোকের লড়াই। ঠিক ভালবাসার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খেতে ব্যস্ত থাকা আমি দেখে নিয়েছিলাম ওঁর একটা দিনের গল্প।
বলছি, এক পেয়ারা বিক্রেতার কথা। আলো নেই, মাথায় ছাতা নেই, বসার নির্দিষ্ট জায়গা নেই, ফুটপাতে একটা ঝুড়ি নিয়ে ভাল-খারাপ মেশানো পেয়ারা বিক্রি করেন। হিন্দুস্তান পার্ক, বড়লোকদের জায়গা, শহরের অন্যতম বিখ্যাত এলাকাও বটে। সেখানে মাঝেমধ্যেই নানা প্রদর্শনী হয়, মেলা বসে ঝাঁ চকচকে জিনিসের, কত কী খাবারের দোকান! মাঝে জায়গা হয় না এই বুড়ো লোকটার। এটুকু সময় আর খুব অসুস্থতা বাদে রোজ তিনি পেয়ারা নিয়ে আসেন, বসেন বাসন্তী দেবী কলেজের বিপরীত গলির ফুটপাতে।
লোকে দরাদরি করেন, কেউ কেনেন, কেউ কেনেন না। বিক্রি না হলে কোনওদিন রাত ১১টা পর্যন্তও থেকে যান।
সুজিত সরদার, ৭৬ বছরের। মাসে টেনেটুনে মাত্র ৩০০০ টাকা আয় করেন পেয়ারা বিক্রি করে। প্রতিদিন ৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি যাতায়াত করেন সামান্য টাকাটুকু রোজগারের জন্য। মাথায় থাকে ভারী বোঝা, কয়েক কেজির পেয়ারার ভার কম নয় তাঁর কাছে। সেসব নিয়ে হাসি মুখেই আসেন। লোকে নেয়, কলেজের ছেলেমেয়েরা নেয়, এলাকার লোকজনের কাছে এখন তিনি বেশ পরিচিত। ভাল ফ্রেশ পেয়ারা এলে তাঁরাও নেন।
আজকাল তেমন শুনতে পান না কানে, খুব স্বাভাবিকভাবে চোখেও ঝাপসা দেখেন খানিকটা। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। কপাল ভাল থাকলে দিনে ২০০ টাকা রোজগার হয়, না হলে দিনে ১০০ টাকা কোনও মতে। সেই দিয়ে শুধু পেটটুকু ভরে যায়। জামা কাপড় কেনারা টাকাটাও জোটে না। এরপরও লোকে দামাদামি করেন, সুজিতবাবু কিছু বলতে পারেন না কারণ তর্ক ঝগড়া করার লোক তিনি নন। তাই লাভ না হলেও পেয়ারা খেতে এলে কেউ খালি হাতে ফেরান না। আর তাঁর লড়াই, জীবনের গল্প না জেনেই অনেকে সেই পেয়ারা খুশি মনে নিয়ে চলে যান।
আরও পড়ুনঃ জোট পাকা! মঙ্গলবার রাতেই বিমানের সঙ্গে বৈঠক হয়ে গেল নওশাদের
যখন সকলে এই বয়সে রেস্ট নিচ্ছেন, কাজের ভার অন্য কারও কাঁধে তুলে দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এদিক ওদিক, তখন শহরের বুকে বেঁচে থাকার এক অদ্ভুত, অসম লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন সুজিতবাবু। কেউ তাঁর কথা জিজ্ঞাসা করেন না, কেউ ভাবেন না, দৌড়াদৌড়ির মাঝে ‘পেয়ারা নিন না, দুটো পেয়ারা নিন’ শুনে হয়তো দাঁড়িয়ে পড়েন, ব্যাস আর কী চাই!
তাঁর করুণ মুখ দেখে যখনই কেউ জিজ্ঞাসা করেন, এই বয়সেও কেন কাজ করছেন, একটাই উত্তর দেন, কষ্ট যতই হোক, হাত পাতবেন না কারও কাছে, ভিক্ষা একেবারেই নয়।
আসলে এ জগতে ‘সবাই সুখী হতে চায়, কেউ সুখী হয় কেউ হয় না।’









