না ফেরার দেশে বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য মুকুল রায়। রাত প্রায় দেড়টা নাগাদ সল্টলেকের এক বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর পর তৃণমূল কংগ্রেস গঠনে ও সংগঠনের বিস্তারে যার নাম এক কথায় উঠে আসে তিনি ছিলেন মুকুল রায়। যুব কংগ্রেস থেকে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা রায় ১৯৯৮ সালে মমতার সঙ্গে হাত মিলিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। খুব দ্রুতই তিনি দলের অন্যতম মুখ ও মমতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে উঠে আসেন। ২০১১ সালে বামফ্রন্টকে পরাজিত করে তৃণমূলের ঐতিহাসিক জয়ে এবং পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা বড় ভূমিকা নিয়েছিল বলে দলীয় নেতারা মনে করেন।
আরও পড়ুনঃ রাত তখন দেড়টা, “যাহাই BJP তাহাই তৃণমূল”; চলে গেলেন বঙ্গ রাজনীতির চাণক্য
দলে তাঁর প্রভাব এতটাই ছিল যে ২০১২ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৎকালীন রেলমন্ত্রী দিনেশ ত্রিবেদীকে সরিয়ে মুকুল রায়কে রেলমন্ত্রীর পদে বসান। সেই সময় দলের অন্দরে বলা হত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আবেগ ও জনসমর্থনের কেন্দ্রবিন্দু হলেও সংগঠন চালানোর নেপথ্য কারিগর ছিলেন মুকুল রায়। রাজ্যের প্রায় প্রতিটি ব্লকে তাঁর সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক ছিল সুদৃঢ়।
তবে ২০১৫ সালে নারদ ও সারদা কেলেঙ্কারিতে তাঁর নাম জড়ানোকে কেন্দ্র করে মমতা-মুকুল সম্পর্কের অবনতি ঘটে। পরবর্তী সময়ে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তিনি ভারতীয় জনতা পার্টি-তে যোগ দেন, যা বাংলার রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে। বিজেপিতে যোগ দিয়ে তিনি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। সেই সময় দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয় বাংলায় সংগঠন মজবুত করতে মুকুল রায়ের দক্ষতাকে কাজে লাগান। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ১৮টি আসন জয়কে অনেকেই তাঁর সাংগঠনিক কৌশলের ফল বলে মনে করেন।
পরবর্তীতে দলের সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি পদে নিয়োগ করেন। যদিও কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার আশা পূরণ হয়নি। ২০০১ সালে জগদ্দল কেন্দ্র থেকে তৃণমূল প্রার্থী হিসেবে বিধানসভা নির্বাচনে লড়ে রাজনৈতিক জীবনের নির্বাচনী অভিষেক হয় তাঁর। যদিও সে সময় তিনি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ২০০৬ সালের এপ্রিলে তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সাল থেকে তিন বছর রাজ্যসভায় দলের নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইউপিএ-২ সরকারের আমলে তিনি প্রথমে নৌ-পরিবহন মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে রেলমন্ত্রকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব সামলান। ২০১২ সালে রেল বাজেটে ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা ঘিরে বিতর্কের জেরে দিনেশ ত্রিবেদী ইস্তফা দিলে মুকুল রায় দেশের রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়ছিল বলে রাজনৈতিক মহলে জল্পনা ছিল। কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে জয়ী হলেও নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম ঘোষণা হলে অসন্তোষ আরও বাড়ে। এরই প্রেক্ষিতে শেষ পর্যন্ত তিনি তৃণমূল কংগ্রেসে প্রত্যাবর্তন করেন। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে মুকুল রায় এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও তাৎপর্যপূর্ণ নাম। তাঁর প্রয়াণে বিরাট শূন্যস্থান তৈরি হল বঙ্গ রাজনীতিতে।
উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচড়াপাড়ায় জন্ম মুকুল রায়ের। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে মাদুরাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জন প্রশাসনে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।









