ইজ়রায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আবহে ইরানের অন্দরমহলে তৈরি হয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক সংকট। যুদ্ধের আগুনে যখন গোটা পশ্চিম এশিয়া অস্থির, ঠিক তখনই দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রে দেখা দিয়েছে অস্বাভাবিক নীরবতা এবং অনিশ্চয়তা। সুপ্রিম লিডার হিসেবে ঘোষিত মোজতবা খামেনেইয়ের কোনও খোঁজ মিলছে না এই পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত করেছে জল্পনা ও উদ্বেগ।
আরও পড়ুনঃ নাম বাদ কেন? অগ্নিগর্ভ মালদহের কালিয়াচক
এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই দেশের ক্ষমতার রাশ কার্যত নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে IRGC। ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেসকিয়ান এখন কার্যত কোণঠাসা। মধ্যপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত পেজেশকিয়ান প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিতে গেলেও বারবার বাধার মুখে পড়ছেন বলে খবর।
সূত্রের খবর, যুদ্ধের শুরুতেই প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনেই নিহত হওয়ার পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে নতুন সুপ্রিম লিডার হিসেবে সামনে আনা হয়। কিন্তু ঘোষণার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। এই অনুপস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন উঠতেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, মোজতবা খামেনেইয়ের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক হামলায় তিনি গুরুতর জখম হয়েছেন এবং সম্ভবত গুরুতরভাবে অক্ষম হয়ে পড়েছেন। একই সুর শোনা গিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা মহল থেকেও। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলির একাধিক রিপোর্টে ইঙ্গিত মিলছে, তিনি কোমায় থাকতে পারেন এবং তাঁকে ঘিরে কড়া নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে ইরানের শক্তিশালী সামরিক সংগঠন ইসলামিক রেভোলুশনারি কর্পস বা IRGC।
সূত্রের দাবি, সুপ্রিম লিডারের সঙ্গে দেখা করার জন্য একাধিকবার আবেদন জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু সেই আবেদন বারবার খারিজ করে দিয়েছে IRGC নেতৃত্ব। ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় কার্যত এক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার মুখে, আর সেই শূন্যস্থান পূরণ করছে সামরিক প্রভাব।
আরও পড়ুনঃ দ্বন্দ্বে জেরবার বামফ্রন্ট! ISF-কে নিয়ে ‘বিদ্রোহ ঘোষণা’ FB ও RSP-র
বর্তমানে দেশের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে IRGC-নিয়ন্ত্রিত একটি ‘মিলিটারি কাউন্সিল’। মন্ত্রিসভা গঠন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক নিয়োগ সব ক্ষেত্রেই তাদের চূড়ান্ত মতামত কার্যকর হচ্ছে। জানা গিয়েছে, গোয়েন্দা মন্ত্রী হিসেবে হোসেন দেহগানকে নিয়োগ করতে চেয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট। কিন্তু IRGC প্রধান আহমেদ বহিদির আপত্তিতে সেই প্রস্তাব ভেস্তে যায়। স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে যুদ্ধের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের অধিকার থাকবে সেনার হাতেই।
ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণও এখন IRGC-র হাতে চলে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি নিরাপত্তার উপরও প্রভাব পড়তে পারে। প্রাক্তন সুপ্রিম লিডারের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা আধিকারিক আলি আসগর হেজাজি আগেই সতর্ক করেছিলেন মোজতবাকে ক্ষমতায় বসানো হলে দেশের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর হাতেই চলে যেতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে বলে মনে করছে বিশ্লেষক মহল।



