বাংলায় পুজোর বৈচিত্র্য বিভিন্ন। এখন সারাবছর ধরেই মায়ের পুজো হয়ে থাকে, সেটা নানা রূপে। শিরোনাম দেখে অনেকেই বুঝবেন আরেক গণেশজননী পুজোর কথা আজ বলবো। শান্তিপুরের কাঁসারিপাড়া গণেশজননীর কথা আগেই বলা হয়েছিল সেটা হয় মাঘী কৃষ্ণা তৃতীয়ায়। এই গণেশজননী পুজোটি চন্দননগরের কাছারিঘাট গোন্দলপাড়ার, পুজো দুর্গাপুজোর ন্যায় চারদিন, শুরু হয় বুদ্ধ পূর্ণিমায়।
চন্দননগর এমনিতেই প্রসিদ্ধ জগদ্ধাত্রী আরাধনায়, কিন্তু অনেকগুলি ভিন্ন পুজো আছে এই চন্দননগরে যেগুলোর গুরুত্ব কিছু কম নয়। বুদ্ধ পূর্ণিমায় বাংলা যেখানে গন্ধেশ্বরী মায়ের আরাধনায় রত ঠিক সেই সময় এই পুজো হচ্ছে। তফাত মূর্তিতত্ত্বে।
আরও পড়ুনঃ চামেলির জায়গায় দায়িত্বে বলাই; ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ফের ওসি বদল কালীঘাটে
আমরা দেখেছি গন্ধেশ্বরী মা চতুর্ভুজা। দেখলেই মনে হবে এই যুদ্ধ করতে নামবেন। কিন্তু এই মা একদম ঘরের মায়ের মতো, কোলে ছোট্ট গণপতি। আর দুজনে চেপে আছেন মহাসিংহের পিঠে। দেবীর দুইপাশে থাকেন জয়া- বিজয়া – মায়ের পার্মানেন্ট সহচরীরা। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। মায়ের বামপাশে আছেন স্বয়ং ব্রহ্মা – কমবয়সী ব্রহ্মা। ডানপাশে আছেন নারদমুনি- এধরনের নারদ মুনি শান্তিপুরের অন্নপূর্ণা ও গণেশজননী উভয় মূর্তিতে আছে।
পুজো কত বছরের যদি জানতে হয় আপনি গিয়ে ফ্লেক্স ব্যানারে দেখবেন এবারে ৭৮ বর্ষের। কিন্তু ইতিহাস বলে অন্য কথা।
৭৮ বছর এই পুজোটা নিয়মিত হয়ে চলেছে। এর আগেও পুজোটা হয়েছে । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন পুজোটি বন্ধ হয়ে যায়। চন্দননগরের মণ্ডল পরিবারের আয়োজিত এই ঘরোয়া পুজো আজকে জনসাধারণের জন্য। এই পুজোর সূচনা তাই কেউ বলবে ১৮৮০ সাল থেকে শুরু, কেউ বলবে ৩০০বছরেরও আগে।
চন্দননগরের ঔপনিবেশিক শাসন সম্পর্কে পড়তে গেলে ফ্রান্সের কথা আসে। চন্দননগর ছিল ফরাসি উপনিবেশ যা সেই ক্লাস সেভেন-এইট থেকে পাঠ্য বইয়ে আমরা পড়ে আসছি। তখন চন্দননগরে বাণিজ্যের জাহাজ আসতো কাকদ্বীপ থেকে। মণ্ডল পরিবার ছিল বণিক সম্প্রদায়। এখন এইখানে পুজোর দুটো দিক আসে ব্যাখ্যা করার। কেউ বলবে পোর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ থেকে রক্ষার্থে স্বপ্নাদেশে মায়ের পুজোর সূচনা, আবার কেউ বলবে বাণিজ্য করতে গিয়ে মণ্ডল পরিবারের একবার দুর্যোগ নেমে আসে। মায়ের স্বপ্নাদেশে তাদের বাণিজ্যে গৌরব পুনরায় ফিরে আসে। যে কারণেই হোক না কেন এই পুজোর সূচনা হল। মণ্ডল পরিবারের পূর্বপুরুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ছিল যারা পরবর্তীতে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন। সেখান থেকেই সম্ভবত বুদ্ধ পূর্ণিমার মতো এই নির্দিষ্ট তিথিটা এসেছে পুজোর সূচনার জন্য।
ঠাকুর দেখতে মোটামুটি চন্দননগরের জগদ্ধাত্রীর মতোই। আসলে নির্দিষ্ট স্থানের কারিগরদের শৈলী একইরকম হয়ে থাকে। সেটাই সবার থেকে তাকে আলাদা করে। আপনি মণ্ডপে গেলে পাশেই জগদ্ধাত্রীর কাঠামো দেখতে পাবেন যেখানে জগদ্ধাত্রী পুজোও হয়। এই মুখ মনকে উৎফুল্ল করে। কলকাতার মুদিয়ালি ক্লাবেও মাতৃ প্রতিমা এই চন্দননগরের মতো হয়। এখানেই চন্দননগরের সার্থকতা। আমি গর্বিত এই হুগলির সন্তান।
পুজো হবে চারদিন, ১তারিখে শুরু হয়েছে, সম্ভবত ৫তারিখ এবারের বিসর্জন। পুজো উপলক্ষে বসে মেলা। পাশেই রয়েছে গঙ্গার ঘাট। আর ঐ জায়গাতেই পুজোর পাশেই সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির আছে যেটি গোন্দলপাড়ার সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির। সাথে আছে আরেকটি বাবা ভোলানাথের মন্দির।
আরও পড়ুনঃ আগামীকাল ‘পরিবর্তন’-‘প্রত্যাবর্তন’-এর দিন রাজ্যজুড়ে বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস
এই পুজোর মূল উদ্দেশ্য ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতিসাধন। মায়ের কোলে গণেশ আছেন, ব্যবসায় ওনার থেকে বড় গুরু আর কেই বা আছেন? এখানে বাড়তি পাওনা মা, মা থাকার জন্য গণপতি চঞ্চল নন। অর্থাৎ এই মূর্তি একপ্রকার জানিয়ে দেয় কেন ব্যবসার উন্নতিকল্পে এই পুজো। মানকুণ্ডু স্টেশনে নেমে টোটো/অটোয় পুজোর জায়গার নাম বললেই সহজে যাওয়া যাবে।
মা এখানে কোলে সন্তানকে ধারণ করে আছেন, আবার সিংহের পিঠে চেপে আছেন। একসাথে মায়ের করুণাময়ী রূপ, সাথে মা জগতের কল্যাণসাধনেও পিছপা নন। শক্তি আরাধনাই আমাদের অন্তরের শক্তিকে জাগিয়ে তোলে। বাঙালির বড় সম্পদ শক্তি সাধনা।


