শুভজিৎ মিত্র,কলকাতা:
বঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের হাত ধরে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলেও,শাসক শিবিরের অন্দরে এখন অস্বস্তির চোরা স্রোত।দীর্ঘ লড়াইয়ের পর,ক্ষমতায় এসেও বিজেপি কি সেই পুরনো ‘দলবদলু’ সংস্কৃতিকেই আঁকড়ে ধরছে? রাজনীতির অলিন্দে কান পাতলে এখন এই গুঞ্জনই শোনা যাচ্ছে।নির্বাচনের প্রাক্কালে সঙ্ঘ পরিবারের আদর্শকে সামনে রেখে, শীর্ষ নেতৃত্ব বারবার হুঙ্কার দিয়েছিলেন যে,দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত কোনো ‘বেনোজল’কে ঠাঁই দেওয়া হবে না।কিন্তু বর্তমানের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে,সেই অবস্থান থেকে দলের পিছু হটা কি আদতে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
ঐতিহাসিক ভুলের পথ প্রশস্তীকরণ!
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্রেফ নিরঙ্কুশ ও প্রশ্নাতীত ক্ষমতার স্বাদ পেতে গিয়ে,দলবদলুদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া বিজেপির জন্য ‘পলিটিক্যাল বুমারাং’ হতে পারে। যে সকল নিচুতলার কর্মী ও নেতৃত্ব তৃণমূলের চরম দমনপীড়ন সহ্য করে,জেল-জুলুম উপেক্ষা করে সংগঠনকে আজকের এই জয়ের শিখরে পৌঁছে দিয়েছেন,তাঁদের আবেগ ও লড়াইকে এভাবে উপেক্ষা করা এক ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।সঙ্ঘের অনুশাসনে পুষ্ট একটি দলের পক্ষে ক্ষমতার লোভে নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়া কেবল সাংগঠনিক ক্ষতি নয়,বরং জনমানসে দলের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ তৃণমূলের মত একই ভুলের পথে বিজেপি! শপথ অনুষ্ঠানে তারকাদের মেলা
কর্মীমহলে গভীর উৎকন্ঠা!
দলের পুরোনো কর্মীদের মধ্যে এখন গভীর উৎকণ্ঠা। তাদের আশঙ্কা,’বাইরে থেকে আসা সুবিধাবাদী নেতারা ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিলে, প্রকৃত লড়াকু কর্মীরা গুরুত্ব হারাবেন। এই ‘গুরুত্ব হারানোর ভয়’ দলের মজবুত সাংগঠনিক ভিটে ফাটল ধরাতে পারে।দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত কর্মীদের সরিয়ে রেখে যদি নবাগতদের প্রাধান্য দেওয়া হয়,তবে আগামী দিনে দলের জন্য রক্ত ঘাম করা কর্মীবাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে যেতে পারে।যে বিপুল জনাদেশের ওপর দাঁড়িয়ে এই সরকার গঠিত হয়েছে। সেই সংহতি বজায় রাখার পরিবর্তে, সুবিধাবাদীদের ভিড় বাড়লে দলের স্বকীয়তা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
ইতিহাসের থেকে শেখার প্রয়োজনীয়তা
পূর্বতন শাসকদল তৃণমূলের পতনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়া,এই মুহূর্তে বিজেপির জন্য সবথেকে জরুরি।বাম জমানার অবসান ঘটিয়ে,তৃণমূল যখন ক্ষমতায় এসেছিল।তখন বাছবিচারহীনভাবে অন্য দলের নেতাদের দলে নেওয়াটাই ছিল,’তাদের অভ্যন্তরীণ ক্ষয়ের মূল কারণ।’সেই ‘বেহিসাবি বেনোজল’ যেমন তৃণমূলের ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল,ঠিক একই চিত্রনাট্যের পুনরাবৃত্তি পদ্মশিবিরের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।জনগণের কাছে বিজেপি নিজেকে,একটি ‘সুশৃঙ্খল ও ভিন্নধর্মী’ দল হিসেবে তুলে ধরেছিল।কিন্তু দলবদলুদের ভিড়,সেই ভাবমূর্তিকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে।
আরও পড়ুনঃ বেনোজল রুখতে মরিয়া পদ্মফুল শিবির; বাম, তৃণমূল হয়ে এবার রামের দরজায় মিরজাফরের দল!
আসলে, বিজেপি একটি “ক্যাডার-ভিত্তিক ও আদর্শগত রাজনৈতিক সংগঠন।“সেখানে তৃণমূলী বিধায়কদের বা সুবিধাবাদী নেতাদের অন্তর্ভুক্তি দলের ‘দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যের পরিপন্থী।‘কেবল গাণিতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বাড়াতে গিয়ে যদি দলের নৈতিক ভিত্তি এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার সাথে আপস করা হয়।তবে অচিরেই,জনরোষের মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।বঙ্গে নতুন ভোরের সূচনা হলেও,সেই ভোরের আকাশ যেন দলবদলের কালো মেঘে ঢাকা না পড়ে।এখন সেটাই বঙ্গ বিজেপির নীতিনির্ধারকদের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ!


