পুরীর জগন্নাথ মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি ভারতীয় ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী। প্রায় এক হাজার বছরের ইতিহাসে এই মন্দির অন্তত ১৮ বার আক্রমণের মুখে পড়েছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র ও মন্দিরের নিজস্ব ‘মাদলাপাঞ্জি’ নথিতে উল্লেখ আছে। এসব আক্রমণের পিছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল মন্দিরের বিপুল ধনসম্পদ লুঠ করা এবং মন্দিরের প্রধান দেবতাদের—জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার—দারুবিগ্রহ ধ্বংস করা। তবে প্রতিবারই মন্দিরের সেবায়েতরা দূরদর্শিতা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে দেবতাদের প্রতিমা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন।
আরও পড়ুনঃ রথের রশি ছুঁতে না পারার আক্ষেপ; পায়ের আঙুলে চক-পেন্সিল ধরে ১৫ বছর শিক্ষকতা!
প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণ ঘটে থাকতে পারে অষ্টম থেকে নবম শতকের মধ্যে, যেখানে রাষ্ট্রকূট সম্রাট গোবিন্দ তৃতীয়ের অভিযানকে এই আক্রমণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। ইতিহাসে ‘রক্তবাহু’ নামে এক আক্রমণকারীর কথাও পাওয়া যায়, যদিও এর সঠিক পরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। পরবর্তীকালে বাংলার সুলতান, দিল্লির শাসক এবং আঞ্চলিক সেনাপতিরা একাধিকবার পুরী আক্রমণ চালান। ইলিয়াস শাহ, ফিরোজ শাহ তুঘলক, ইসমাইল গাজী, কালাপাহাড়, একরাম খাঁ এবং তকি খাঁর মতো নাম ইতিহাসে স্মরণীয়।
বিশেষ করে ১৫৬৮ সালের কালাপাহাড়ের আক্রমণ অত্যন্ত আলোচিত। তিনি বঙ্গের কররানি শাসনের সেনাপতি ছিলেন এবং পুরী মন্দিরে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেন। যদিও মন্দিরের সেবায়েতরা আগেই মূল দারুবিগ্রহ গোপনে সরিয়ে ফেলেছিলেন, তবুও কালাপাহাড় মন্দিরে ধ্বংসযজ্ঞ চালান।

মন্দিরের বর্ণনা অনুযায়ী, পরে ভক্ত বিশর মোহন্তি দারুব্রহ্ম উদ্ধার করে নতুন প্রতিমায় প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও এই ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত, এটি মন্দিরের ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের অংশ।
জগন্নাথ মন্দিরের সেবায়েতরা শত্রুর আগমন খবর পেলে বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেবতাদের প্রতিমা নিরাপদ স্থানে নিয়ে যেতেন। কখনও চিলিকা হ্রদের দ্বীপে, কখনও ঘন জঙ্গলে, কখনও পাহাড়ি গুহায় অথবা নদীপথে দূরের নিরাপদ স্থানে রাখতেন। ফলে বহুবার মন্দির লুট হলেও মূল প্রতিমাগুলো রক্ষা পেত। এই কৌশলই জগন্নাথ সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম কারণ।
মধ্যযুগে এই মন্দির ছিল পূর্ব ভারতের অন্যতম সমৃদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। বিস্তীর্ণ জমি, বিপুল দান, সোনা, রূপা, মূল্যবান রত্ন এবং অসংখ্য সম্পদের অধিকারী এই মন্দির দখল মানে শুধু অর্থ নয়, রাজনৈতিক শক্তিরও হাতছানি। তাই বহুবার আক্রমণের কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই ইতিহাস কেবল মন্দিরের নয়, বরং ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক সংঘর্ষ, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার দীর্ঘ অধ্যায়ের সাক্ষ্য বহন করে।
আজকের দিনে, পুরীর জগন্নাথ মন্দির শুধু ভক্তিভরা পর্যটকদের জন্য নয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গবেষকদের জন্যও এক অসামান্য উৎস। এই মন্দিরের সংগ্রামের ইতিহাস আমাদের শিখায়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য কখনোও সংগ্রাম থেমে থাকা উচিত নয়।


