কুশল দাশগুপ্ত, শিলিগুড়িঃ
ওড়িশার পুণ্যধাম পুরীতে যখন লক্ষ লক্ষ ভক্তের জয়ধ্বনি আর ঢাকের আওয়াজে জগন্নাথদেবের রথের চাকা গড়াতে শুরু করেছে, তখন পূর্ব বর্ধমানের জঙ্গলমহল আউসগ্রামের এক নিভৃত গ্রামে বিষাদের সুর বাজছে। জন্মের পর থেকেই দুটি হাত নেই ৪৭ বছর বয়সী প্রাথমিক শিক্ষক জগন্নাথ বাউরীর। শারীরিক দিক থেকে মহাপ্রভুর সঙ্গে তাঁর অদ্ভুত মিল থাকলেও, হাত না থাকায় আজীবন অধরাই থেকে গিয়েছে রথের রশি ছোঁয়ার সাধ।
আউসগ্রাম ১ নম্বর ব্লকের বেরেন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলুটি গ্রামের এই ‘জীবন্ত জগন্নাথ’-কে প্রতি বছর রথযাত্রার পুণ্যলগ্নে এই অক্ষমতা গভীরভাবে বেদনাতুর করে তোলে।
আরও পড়ুনঃ বড় পদক্ষেপ রেলের! বিস্ফোরক তথ্য, গেটম্যানের গাফিলতিতেই এত বড় দুর্ঘটনা
জন্মের সময় দু’হাতহীন জগন্নাথ বাউরীকে গ্রামের মানুষ রূপকভাবে জগন্নাথদেবের সঙ্গে তুলনা করত। শৈশবে বেলুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর সময় তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ভূতনাথ পাল পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘প্রভু জগন্নাথের নামেই ওর নাম রাখো।’ সেই থেকেই শুরু হয় জগন্নাথের জীবন সংগ্রাম। দারিদ্র্যের মধ্যেও বাবা-মায়ের থেকে কখনো ঈশ্বরের ভরসা হারায়নি এই পরিবার। জগন্নাথের ছোট ভাইয়ের নাম বলরাম, যা আরও মর্মস্পর্শী রূপক।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে জগন্নাথবাবুর আজকের সম্মানের জায়গায় পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে এক অসাধারণ লড়াই। শিক্ষক ভূতনাথ পাল তাঁকে হাত দিয়ে নয়, বরং পায়ের আঙুলে পেন্সিল গুঁজে দিয়ে বাংলা ও ইংরেজি অক্ষর শিখিয়েছিলেন। এরপর কঠোর অধ্যবসায়ের জোরে মাধ্যমিক পাশ করে D.El.Ed সম্পন্ন করেন। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি তিনি আউসগ্রামের জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি পান। ১৫ বছর ধরে পায়ের আঙুলেই চক-পেন্সিল ধরে ব্ল্যাকবোর্ডে অনায়াসে লিখে পাঠদান করছেন। তাঁর এই লড়াইকে কুর্নিশ জানান সহকর্মী, শিক্ষার্থী থেকে অভিভাবকরাও। তিনি স্ত্রী লক্ষ্মী, বাবা-মা, ভাই ও বোনের সঙ্গে সংসার সামলান।
আরও পড়ুনঃ মহালয়া নয়, রথের দিনেই; বিরল দুর্গোৎসব দুর্গাপুরে
তবুও প্রতি বছর রথযাত্রার দিনটি আঘাতের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জগন্নাথবাবু বলছেন, “দেবতা জগন্নাথদেবেরও দুটি হাত নেই, আমারও নেই। আমি ভগবান নই, সাধারণ মানুষ। কিন্তু ওঁর সঙ্গে নিজের মিল থাকার কারণে প্রভু জগন্নাথকেই আরাধ্য মনে করি। এত বড় ভক্ত হয়েও জীবনে কখনো রথের দড়িতে টান দিতে পারিনি। এই অপূর্ণ সাধ আমাকে রথের দিনে খুব আঘাত করে।” তিনি ঘরে বসে ভক্তিভরে মহাপ্রভুর চরণে প্রার্থনা করে দিন কাটান।


