আজ ১১ই আগস্ট। আজকের এই দিনে মাত্র ১৮ বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেছিলেন অমর শহীদ ক্ষুদিরাম বসু কিন্তু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করার এই অদম্য স্পৃহা তাঁর মধ্যে রাতারাতি তৈরি হয়নি। শৈশব থেকেই তাঁর রক্তে মিশে ছিল এক গভীর দেশপ্রেম আর পরোপকারের সহজাত আবেগ। মাত্র ১৩ বছর বয়সে স্কুলে পড়ার সময় যখন সহপাঠী ফণিভূষণকে দেশী পোশাক পরার জন্য অন্য ছাত্ররা হাসাহাসি করছিল, তখন কিশোর ক্ষুদিরাম বুক ফুলিয়ে তাঁর পাশে দাঁড়ান। ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় যত পুরানো, যত মোটা, যত ছেঁড়া বা যত নতুন বা যত আনকোরা হোক না কেন, তা আমাদের দেশের জিনিস। তাতে আমাদের অপমান বা লজ্জার কি কারণ থাকতে পারে? দেশী কাপড় আমাদের গোলামির চিহ্ন তো নয়।’ তাঁর এই একটি কথাই বন্ধুদের ভুল ভেঙে দেয়, তারাও প্রতিজ্ঞা করে আর কখনো বিদেশী কাপড় পরবে না।
আরও পড়ুনঃ অমাবস্যার রাতে জেগে ওঠে অলৌকিক রহস্য, পশ্চিমবঙ্গের ৩ ভূতুড়ে গ্রাম
পড়াশোনার গণ্ডি বা ডিগ্রির মোহ ক্ষুদিরামকে কোনোদিন বাঁধতে পারেনি। বইয়ের পাতার চেয়ে তিনি বেশি ভালোবাসতেন মানুষকে। বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ার যে অদম্য সাহস তাঁর ছিল, তা দেখে শিক্ষকরা অবাক হতেন। খুব ছোট বয়স থেকেই তিনি অনুভব করেছিলেন পরাধীন ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় কান্না হলো সাধারণ মানুষের দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট। আর সেই কষ্ট লাঘব করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।
কনকনে শীতের এক সকালে এক ভিখারী যখন গায়ে কাপড় না থাকায় ঠকঠক করে কাঁপছিল, তখন ক্ষুদিরামের ঘরে তাকে দেওয়ার মতো কিছু ছিল না। সম্বল বলতে ছিল কেবল মৃত বাবার স্মৃতিবিজড়িত একটি দামী শাল। এতটুকু দ্বিধা না করে সেই মূল্যবান শালটি তিনি তুলে দেন ভিখারীর হাতে। বাবার স্মৃতি আগলে রাখার চেয়েও মানুষের প্রাণ বাঁচানো যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ এই সহজ সত্যটি তিনি কত অনায়াসে বুঝে গিয়েছিলেন!
আরও পড়ুনঃ টুপটাপ শুরু, নিম্নচাপ অক্ষরেখার সঙ্গে; ঘূর্ণাবর্তজোড়া সিস্টেমে বাড়ছে দুর্যোগের আশঙ্কা!
পরিবারের লোক যখন বললেন, ‘ভিখারী তো ওটা বিক্রি করে ফেলবে!’, ক্ষুদিরাম হেসে উত্তর দিয়েছিলেন শাল বিক্রি করে যদি ওই মানুষটার কয়েকদিনের পেটের ভাত জোটে, তবেই তাঁর বাবার স্মৃতি সার্থক হবে। বাক্সে রাখা কাপড়ের চেয়ে একটা ক্ষুধার্ত মুখের আহার যে কত বড়, শৈশবেই তা বুঝে গিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। ফাঁসির মঞ্চে ওঠার বহু আগেই এই খুদে বীরের হৃদয়ে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ আর ত্যাগের বীজ রোপণ হয়ে গিয়েছিল, ১১ই আগস্টের রক্তিম ভোরে সেটাই রূপ নিয়েছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের সবচেয়ে উজ্জ্বল ইতিহাসে।


