বিশেষ সংবাদ প্রতিনিধি, ক্যানিং (দক্ষিণ ২৪ পরগনা):
দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ক্যানিংয়ের ঐতিহ্যবাহী ভট্টাচার্যবাড়ির দুর্গোৎসব বাংলার বনেদি বাড়ির পূজার ইতিহাসে এক অনন্য ও রহস্যময় মাত্রা বহন করে চলেছে। প্রায় ৪১২ বছরের সুপ্রাচীন এই পূজার প্রতিমা রূপায়ণ থেকে শুরু করে পূজাপদ্ধতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে প্রাচীন সব লোকবিশ্বাস, ইতিহাস ও বিরল আচার-অনুষ্ঠান।
গাঢ় কালো মুখাবয়ব এবং তামাটে বর্ণযুক্ত দেবীর প্রতিমাটি প্রতিবছর বহু শতবর্ষ প্রাচীন কাঠের কাঠামোর ওপরই নির্মাণ করা হয়ে আসছে।
আরও পড়ুনঃ কৌশিকী অমাবস্যা; অন্য সব অমাবস্যার থেকে একটু আলাদা!
ভট্টাচার্যবাড়ির প্রতিমার বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহাসিক আচার
এই পূজার দেবীপ্রতিমা গঠন ও রূপায়ণে বেশ কিছু বিরল বৈশিষ্ট্যের ছাপ স্পষ্ট:
| বিষয়ের ক্ষেত্র | ভট্টাচার্যবাড়ির বিশেষ প্রথা ও লোকগাথা |
| প্রতিমার বিশেষ রূপ | দেবীর গাত্রবর্ণ তামাটে এবং মুখাবয়ব গাঢ় কালো। মৃৎশিল্পীরা চালের গুঁড়ো ও সনাতনী প্রাকৃতিক উপাদানের বিশেষ মিশ্রণ ব্যবহার করে প্রতিমা নির্মাণ করেন। |
| মৃৎশিল্পীদের নিয়ম | জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর মৃৎশিল্পীরা দেবীর মুখের দিকে তাকান না। অতীতে এক মৃৎশিল্পী অসাবধানতাবশত দেবীর মুখ দেখে বাকশক্তি বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে পরিবারে লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। |
| দগ্ধ বা পোড়া রূপের জনশ্রুতি | কথিত রয়েছে, এক শতাব্দী পূর্বে অগ্নিকাণ্ডের একটি ঘটনার পর থেকে পারিবারিক ঐতিহ্য অনুযায়ী দেবীকে বিশেষ ‘দগ্ধ’ বা ‘পোড়া’ রূপে আরাধনা করার রীতি চলে আসছে। |
আরও পড়ুনঃ সব জল্পনার অবসান, পূজা হবে নিজের পুরনো মেজাজেই, আজ থেকেই শুরু আয়োজন
পশুবলি থেকে বৈষ্ণবমতে রূপান্তর
ভট্টাচার্যবাড়ির পূজাপদ্ধতিতে সময়ের সাথে সাথে সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে:
-
আদি বলিপ্রথা: সূচনা পর্বে এই পূজায় নিয়ম মেনে ছাগ ও মেষ (ভেড়া) বলির রীতি প্রচলিত ছিল।
-
বর্তমান প্রথা: পরবর্তীতে জীবহিংসা ত্যাগ করে বৈষ্ণব ভাবধারায় সাড়ম্বরে লাউ, আখ ও ছাঁচি কুমড়ো নিবেদনের মাধ্যমে ‘আখ বা ফল বলি’-র আধুনিক রীতি চালু করা হয়।
ইতিহাস, সুপ্রাচীন ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে আজও ভট্টাচার্যবাড়ির ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপূজা দক্ষিণ ২৪ পরগনার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে তার স্বতন্ত্র পরিচিতি বজায় রেখেছে।


