চন্দন দাস, কলকাতাঃ
মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়া ওই মানুষটা শুধুই জলপাইগুড়ি জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক নন—ওটা আসলে আমাদের মরে পচে যাওয়া সমাজের খসে পড়া মেরুদণ্ড!
হাততালি দিন, জোরে হাততালি দিন! করতালি দিয়ে বরণ করে নিন একবিংশ শতাব্দীর সেই ‘সোনার টুকরো’ ছাত্রকে, যে প্রকাশ্য দিবালোকে বুক ফুলিয়ে প্রমাণ করে দিল—আমাদের শিক্ষা কারখানাগুলো এখন আর মানুষ তৈরি করে না, হিংস্র এবং অকৃতজ্ঞ জানোয়ার প্রসব করে।
আজকের দিনে পাশের বাড়ির ছেলে পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে যে সমাজের বুক জ্বলে খাক হয়ে যায়, সেখানে নিজের পেটের সন্তান না হয়েও নিঃস্বার্থভাবে অন্যের ছেলের সাফল্যে যে নির্বোধ জাতটা বুক ফুলিয়ে আনন্দ পায়—তাদের নাম ‘শিক্ষক’। এই চরম বোকামিরই যোগ্য পুরস্কার মিলল তো আজ? রক্তে ভেসে গেল জলপাইগুড়ির স্কুলের চত্বর।
কোথায় গেল সেই জ্ঞানপাপী তথাকথিত ‘সুশীল’ সমাজ? শিক্ষকের সামান্য চোখ রাঙানিতেই যাদের আহ্লাদী বাছাধনদের ‘মানসিক ট্রমা’ হয়ে যেত, আজ দশম শ্রেণীর এক কিশোরের ধাক্কায় প্রবীণ শিক্ষকের ফাটা কপাল আর রক্তাক্ত জামা দেখে তাদের মানবাধিকারের জিভ কোন গর্তে সেঁধিয়ে গেল? সামান্য শাসনটুকু আজ ‘অপরাধ’, আর শিক্ষকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াটা আধুনিক ‘অধিকার’! এই রক্ত শুধু একজন শিক্ষকের শরীর থেকে ঝরেনি, এ রক্ত এই পঙ্গু সমাজের নির্লজ্জ মুখে চপেটাঘাত। মহাভারতে একলব্য গুরুর চরণে নিজের আঙুল কেটে গুরুদক্ষিণা দিয়েছিলেন, আর আধুনিক বাংলার কুপুত্ররা মাস্টারের মাথা ফাটিয়ে রাজপথে রক্তের আলপনা এঁকে দিল। চমৎকার গুরুদক্ষিণা!
সন্তানকে শুধু ৯৯% পাওয়ার প্রতিযোগিতা শিখিয়েছেন, কিন্তু মানুষ হতে শেখাননি। জেনে রাখুন, আজ যে ছেলেটি শিক্ষকের গায়ে হাত তুলতে বুক কাঁপে না, কাল সম্পত্তির ভাগ নিয়ে আপনার গলা টিপে ধরতেও তার হাত কাঁপবে না। বিষবৃক্ষ রোপণ করেছেন, এখন ফল খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন। ঘুমিয়ে থাকুন সমাজ, মরার মতো ঘুমিয়ে থাকুন। নিজের রক্তে যখন ঘর ভাসবে, তখন বুঝবেন—যেদিন মাস্টারমশাই রক্তাক্ত হয়েছিলেন, সেদিনই আসলে এই সভ্যতার মৃত্যুঘণ্টা বেজে গিয়েছিল!


