এক সময় সকাল হলেই ঘরের জানালায় চড়ুইয়ের কিচিরমিচির ডাকে ঘুম ভাঙত। বারান্দার কার্নিশ, ভেন্টিলেটর কিংবা ছাদের কোণে শুকনো ঘাস-পাতা দিয়ে ছোট্ট বাসা বুনে এই চেনা পাখিগুলো হয়ে উঠত আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু আজ সেই পরিচিত সহজ-সরল ডাকটাই যেন শহর ও শহরতলির ভিড় থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
শহরাঞ্চল যত বড় হয়েছে, তত বেড়েছে কংক্রিটের জঙ্গল। কমেছে গাছপালা, উধাও হয়েছে খোলা উঠোন ও কাঁচা বাড়ির নিরাপদ আস্তানা। ফলে আমাদের চারপাশ থেকে প্রতিদিন নিঃশব্দে দূরে সরে যাচ্ছে চড়ুইয়ের দল।
আরও পড়ুনঃ কালো ধোঁয়ায় ঢাকল আকাশ; রিয়াধের বিমানবন্দরে হামলা হুথিদের, চরম বিপদে পর্যটকরা
চড়ুই কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণসমূহ
পরিবেশবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, চড়ুই পাখির এই সংকটজনক পরিস্থিতির পেছনে একক কোনো কারণ নেই, বরং একাধিক প্রতিকূলতার যৌথ প্রভাব দায়ী:
-
আবাসস্থল ও বাসার অভাব: আধুনিক স্থাপত্যের কাঁচ ও কংক্রিটের ফ্ল্যাটবাড়িতে ভেন্টিলেটর বা কুলুঙ্গির সুবিধা না থাকায় চড়ুই বাসা বাঁধার জায়গা পাচ্ছে না।
-
খাদ্যের তীব্র সংকট: কৃত্রিমভাবে পরিষ্কার করা শহর ও প্যাকেটজাত খাবারের যুগে গৃহস্থালির ফেলে দেওয়া শস্যদানা কমে গেছে। পাশাপাশি ক্ষতিকর কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে চড়ুই ছানাদের প্রধান খাদ্য ছোট ছোট পোকামাকড় বা লার্ভা বিলুপ্ত হচ্ছে।
-
পরিবেশ দূষণ: বায়ু ও শব্দদূষণ এই খুদে পাখিদের প্রজনন ও বসবাসের অনুকূল পরিবেশ ধ্বংস করছে।
(উল্লেখ্য, অনেকেই মোবাইল টাওয়ারের তড়িৎ-চৌম্বকীয় বিকিরণকে চড়ুই কমার একমাত্র কারণ মনে করেন, তবে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণায় এর পক্ষে একক ও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ এখনও মেলেনি। মূলত বাসস্থান ও খাদ্যের সংকটই প্রধান কারণ।)
আরও পড়ুনঃ সাতসকালে মেঘে ঢাকল কলকাতার আকাশ, দক্ষিণবঙ্গে প্রবল বজ্রবিদ্যুৎ সহ ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা
আমাদের ছোট্ট পদক্ষেপে ফিরতে পারে শৈশব
আমরা কি এমন একটি ভবিষ্যৎ পৃথিবী রেখে যাব, যেখানে পরবর্তী প্রজন্ম চড়ুই পাখিকে শুধু বইয়ের ছবি কিংবা ইন্টারনেটের পর্দায় দেখবে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের দৈনন্দিন কিছু ছোট ছোট মানবিক অভ্যাসে।
আজই যদি আপনার বাড়ির আশপাশে, বারান্দায় বা ছাদে চড়ুইদের যাতায়াত দেখতে পান, তবে তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসুন:
-
একটি পাত্রে জল ও দানা: বারান্দা বা কার্নিশে একটি ছোট বাটিতে পরিষ্কার পানীয় জল এবং চাল, বাজরা বা কাউনের মতো দানা ছড়িয়ে রাখুন।
-
কৃত্রিম বাসার ব্যবস্থা: সম্ভব হলে কাঠের বা মাটির ছোট্ট ঝুলন্ত খাঁচা/বাসা তৈরির জায়গা করে দিন।
-
সবুজায়ন: বারান্দায় বা টবে কিছু প্রাকৃতিক গাছ লাগান, যা তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও পোকামাকড়ের জোগান দেবে।
প্রকৃতির এই ছোট্ট বন্ধুদের বাঁচিয়ে রাখা আসলে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষেরই নামান্তর। একটু সহানুভূতিই পারে আমাদের বারান্দায় আবার সেই হারিয়ে যাওয়া চড়ুইয়ের গান ফিরিয়ে আনতে।


