২০২৪ সালে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো গঙ্গার নিচ দিয়ে যাতায়াত শুরু করলে সারা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনেকেই জানেন না যে, নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল বা সুড়ঙ্গ নির্মাণের ক্ষেত্রে কলকাতার ইতিহাস প্রায় এক শতাব্দীর পুরনো।
এশিয়ার বুকে নদীর তলদেশে নির্মিত প্রথম দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকৌশল বিস্ময় হলো সিইএসসি-র (CESC) তৈরি এই ঐতিহাসিক টানেল।
আরও পড়ুনঃ সাক্ষাৎ যমদূত চলন্ত ট্রেনে, ট্রেনে ঘুরে বেড়াচ্ছে মস্ত বড় বিষাক্ত কালাচ সাপ! হুঁশ কই রেলের?
টানেল নির্মাণের প্রেক্ষাপট ও ইতিহাস
১৯২৬ সালে মেটিয়াবুরুজে তৈরি হয় সিইএসসি-র ‘সাদার্ন জেনারেটিং স্টেশন’। সেখান থেকে হুগলি নদীর অপর পাড়ে হাওড়ায় নির্বিঘ্নে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে গঙ্গার নিচ দিয়ে ক্যাবল টানেল তৈরির পরিকল্পনা করা হয়।
-
নেতৃত্ব: এই যুগান্তকারী কাজের নেতৃত্ব দেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার স্যার হার্লি ডালরিম্পল হে (Sir Harley Dalrymple-Hay)—যাঁর জন্ম হয়েছিল আমাদের বীরভূমে।
-
সূচনা: ১৯৩০ সালে এই টানেল নির্মাণের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
নির্মাণ পদ্ধতি ও কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য
কোনো আধুনিক ভারী যন্ত্রাংশ ছাড়াই সম্পূর্ণ কায়িক শ্রমে ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এই টানেল তৈরি করা হয়েছিল:
| বিষয় ও উপাদান | টানেল নির্মাণের তথ্য |
| গভীরতা ও দৈর্ঘ্য | কলকাতা ও হাওড়া উভয় প্রান্তে ৩৩ মিটার গভীর কুয়ো খুঁড়ে গঙ্গার নিচে ৫৩৮ মিটার দীর্ঘ টানেল তৈরি করা হয়। |
| ব্যাসার্ধ ও ব্যবহৃত সরঞ্জাম | টানেলের ব্যাস ছিল মাত্র ৬ ফুট। এটি কোনো বড় টিবিএম (TBM) ছাড়াই হাত-শাবল ও গাঁইতি দিয়ে কাটা হয়। |
| দেওয়াল সুরক্ষা | মাটি কাটার সাথে সাথে ভেতরে বসানো হতো লোহার রিং (Cast Iron Rings), যা টানেলের শক্ত দেওয়াল হিসেবে কাজ করে। |
| ব্যবহারের উদ্দেশ্য | এটি সাধারণ যাত্রী যাতায়াতের জন্য নয়; মূলত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়। |
আরও পড়ুনঃ পাকিস্তানে ভারী রক্তপাত; কোহাটের ওল্ড পুলিশ লাইন্সে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত অন্তত ৩১, আহত শতাধিক
অধ্যবসায়, আত্মত্যাগ ও বর্তমান অবস্থা
প্রায় ১৩ মাসের নিরলস পরিশ্রমের পর ১৯৩১ সালের জুলাই মাসে টানেলটির নির্মাণকাজ শেষ হয়।
-
স্মারক ও শ্রদ্ধা: চরম প্রতিকূলতায় কাজ করতে গিয়ে দুজন ভারতীয় এবং একজন ইংরেজ—মোট ৩ জন কর্মী প্রাণ হারান। তাঁদের স্মরণে সিইএসসি-র পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মানজনক মেডেল প্রদান করা হয়েছিল।
-
বর্তমান স্থায়িত্ব: সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, নির্মাণের প্রায় এক শতাব্দী বা ১০০ বছর পার হতে চললেও এই ঐতিহাসিক টানেলটি আজ অব্দি সম্পূর্ণ সক্রিয় এবং সফলভাবে বিদ্যুৎ পরিবহণে ভূমিকা রেখে চলেছে।
ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো আমাদের আধুনিকতার প্রতীক হলেও, গঙ্গার তলদেশে লুকিয়ে থাকা এই শতবর্ষী টানেলটি কলকাতার প্রযুক্তিগত ঐতিহ্যের এক অনন্য মাইলফলক।


