বিশেষ আইনি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি:
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে নজিরবিহীন অন্তর্দ্বন্দ্ব ও একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করা হয়েছে। আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী কর্তৃক দায়ের করা এই আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সংবিধানের নিয়মনীতি ও অন্য দুই নির্বাচন কমিশনারের মতামতকে উপেক্ষা করে নেওয়া জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্তগুলি বেআইনি ও অসাংবিধানিক।
আবেদনে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে কোনো সংবিধিবদ্ধ ছাড়পত্র বা আইনি সাকুল্য (Immunity) প্রযোজ্য নয় উল্লেখ করে তাঁর বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ ও বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মামলার মূল বিষয়বস্তু ও অভিযোগসমূহ
সুপ্রিম কোর্টে পেশ করা রিট পিটিশনে প্রধানত নিম্নলিখিত আপত্তি ও দাবিগুলি তুলে ধরা হয়েছে:
-
অন্য দুই কমিশনারের আপত্তি উপেক্ষা: একটি সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র ধরে মামলায় বলা হয়েছে, বিগত ১০ মাসে স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন (SIR) এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। তাঁদের সম্মতি ছাড়াই কমিশন একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা বহু-সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচন কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ার নীতি পরিপন্থী।
-
ফর্ম-৬ (Form 6) সংশোধন বাতিল ও পুরনো ফর্ম ফেরানো: নতুন ভোটার নিবন্ধনের সংবিধিবদ্ধ ‘ফর্ম-৬’-এ ইসিআইনেট (ECINet) পোর্টালে অননুমোদিত পরিবর্তন আনা হয়েছে। ফর্মে আবেদনকারী বা তাঁর পূর্বপুরুষদের (বাবা-মা/দাদা-দাদি) নাম আগের এসআইআর (SIR) তালিকায় ছিল কি না, তা বাধ্যতামূলকভাবে জানতে চাওয়া হচ্ছে। কমিশনার দ্বয়ের মতে, ১৯৬০ সালের নিয়ম সংশোধন না করে আনা এই পরিবর্তন সম্পূর্ণ ‘আইনবহির্ভূত’। আবেদনকারী নতুনদের হয়রানি বন্ধ করতে অবিলম্বে পুরনো ফর্ম-৬ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
-
১৩ কোটি ভোটারের নাম ছাঁটাই ও এসআইটি (SIT) তদন্ত: দেশ জুড়ে এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার ঘটনার নেপথ্যে কোনো কারচুপি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করার আর্জি জানানো হয়েছে।
-
ডেটাবেস কেন্দ্রীকরণ ও ইআরও (ERO)-দের ক্ষমতা খর্ব: নির্বাচন কমিশনের আইটি বিভাগ এবং ডিজি-আইটি (DG-IT)-র মাধ্যমে স্থানীয় ইলেক্টরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের (ERO) সংবিধিবদ্ধ সিদ্ধান্ত বাতিলের ক্ষমতাকে এক ছাতার তলায় এনে ডেটা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে, যা স্থানীয় ভোটার যাচাইকরণ প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আরও পড়ুনঃ রাষ্ট্রপতি ফেরত পাঠালেন বিল, হাইকোর্টেও অস্বস্তি! ‘গুণ্ডা দমন বিল’ নিয়ে বড় ধাক্কা শুভেন্দু সরকারের
মামলার তাৎপর্য ও আইনি অবস্থান
আবেদনকারীর যুক্তি অনুযায়ী, গণপ্রতিনিধিত্ব আইন ও ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশন আইনের বিধান লঙ্ঘন করে নেওয়া যেকোনো পদক্ষেপ ‘সরকারি কাজের এক্তিয়ার বহির্ভূত’। ফলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদমর্যাদাগত কোনো আইনি সুরক্ষার দাবি করতে পারেন না।
বর্তমানে পুরো বিষয়টি দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত হওয়ায়, সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন শুনানিই ঠিক করবে ভারতের নির্বাচন কমিশনের এই আইনি ও প্রশাসনিক সংকটের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে মোড় নেবে।


