বিশেষ প্রতিনিধি, নতুন দিল্লি:
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও অন্য দুই কমিশনারের আপত্তিকে ঘিরে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরুর পর অবশেষে তিন নির্বাচন কমিশনারকে এক টেবিলে বসিয়ে ‘ঐক্যের’ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করল নির্বাচন সদন। শনিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার, নির্বাচন কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী দীর্ঘ আলোচনার পর এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করেন, কমিশনের সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমেই নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে দুই কমিশনার সঁধু ও জোশীর অতীতে তোলা আপত্তিগুলোকে পরোক্ষভাবে মেনে নিয়ে একাধিক নীতিগত সংশোধনের ঘোষণাও করেছে কমিশন।
আরও পড়ুনঃ গতকাল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিনে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ উদযাপন বাংলা পক্ষের
বিতর্কের সূত্রপাত ও যৌথ বিবৃতির মূল বিষয়
সম্প্রতি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তে প্রকাশ পায় যে, গত ১০ মাসে দুই কমিশনার সঁধু ও জোশীর তোলা অন্তত ১৪টি লিখিত আপত্তিকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত বলবৎ করেছেন সিইসি জ্ঞানেশ কুমার। এর পরেই এনডিএ শরিকসহ গোটা বিরোধী শিবির ক্ষোভে ফেটে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শনিবার বৈঠকে বসে তিন সদস্যের ফুল বেঞ্চ এবং পাশাপাশি বসে থাকা ছবি প্রকাশ করে যৌথ বিবৃতি দেয়।
কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে:
-
এসআইআর অনুমোদন: বিহার, পশ্চিমবঙ্গসহ অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিগুলি সর্বসম্মতিতেই জারী করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টও বৈধ বলে রায় দিয়েছে।
-
ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি প্রসঙ্গে: ডেপুটেশনে আসা আধিকারিকের (তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সীমা খন্না) এক্তিয়ার ও নির্দেশ সংক্রান্ত আপত্তি তুলে ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, যা দুই কমিশনারের নির্দেশের পর বাতিল করা হয়েছে।
নীতিগত সংশোধন ও ইআরও-দের ক্ষমতা প্রত্যাবর্তন
সংবাদমাধ্যমে যে বিষয়গুলো নিয়ে দুই কমিশনারের আপত্তির কথা প্রকাশ পেয়েছিল, শনিবারের বিবৃতিতে সেই প্রশাসনিক ত্রুটিগুলো সংশোধনের বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন:
| ক্ষেত্র | পূর্বে উত্থাপিত অভিযোগ | কমিশনের নতুন নীতি ও সিদ্ধান্ত |
| ইআরও (ERO)-দের ক্ষমতা | দিল্লি থেকে কেন্দ্রীয়ভাবে ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ ও স্থানীয় আধিকারিকদের ক্ষমতা খর্ব। | স্থানীয় ইআরও-রাই নথি খতিয়ে দেখে বাদ পড়া বা নতুন নাম অন্তর্ভুক্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। |
| ইসিআইনেট (ECINET) সফটওয়্যার | নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞদের না দেখিয়ে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও এক্সেস ব্লক করা। | সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার ও আইআইটি (IIT) বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ইসিআইনেট পোর্টালে রিভিউ বা পর্যালোচনা করা হবে। |
| বিএলও (BLO) এবং ফর্ম-৬ | সাধারণ মানুষের হেনস্থা ও তথ্যগত অসঙ্গতিতে ইআরও অফিসে সশরীরে হাজিরা। | বিএলও-রা সরাসরি বাড়ি গিয়ে নথি আনবেন। ইআরও-রা প্রয়োজনে অনলাইনে শুনানি করবেন। |
আরও পড়ুনঃ সিপিএম নিয়ে তাঁর ছুতমার্গ নেই; বুদ্ধ-মমতাকে মিলিয়ে দিল শ্রীরামপুর
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট ও সুপ্রিম কোর্টের ট্রাইব্যুনাল
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া ও চূড়ান্ত তালিকা মিলিয়ে বহু মানুষের নাম বাদ গিয়েছিল (চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়েছিল ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম)। কমিশনের শনিবারের বিজ্ঞপ্তিতে নতুন করে নাম তোলার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও ট্রাইব্যুনালে আবেদনকারী ৩৮ লক্ষেরও বেশি মানুষের ভাগ্যে তাৎক্ষণিক স্বস্তি মিলছে না।
আইনজীবী ফিরদৌস শামিমের মতে, “কমিশনের আজকের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে পূর্বে তাদের নেওয়া পদ্ধতিতে বড় ধরনের গলদ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ থাকা সাধারণ নাম তোলার কাজ চালু হলেও, যারা সুপ্রিম কোর্টের ট্রাইব্যুনালে গেছেন, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ ছাড়া তাদের সরাসরি এতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না।”
অভিযোগের সময়সীমা বৃদ্ধি
দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে চলতি এসআইআর সংক্রান্ত আপত্তি বা অভিযোগ জানানোর সময়সীমা বাড়িয়েছে কমিশন। দিল্লিতে অভিযোগ জানানোর মেয়াদ বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর এবং মহারাষ্ট্রে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত করা হয়েছে।
কমিশন নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন ঢাকার চেষ্টা করলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে শনিবারের নেওয়া নীতিগত সংশোধনগুলিই প্রমাণ করে যে বিরোধীদের ও দুই কমিশনারের তোলা অভিযোগগুলি অনভ্যর্থ ছিল না।


