বিশেষ রাজনৈতিক প্রতিনিধি, শ্রীরামপুর:
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর—ঠিক দেড় দশকের ব্যবধান। ক্ষমতা হারানোর চার মাসের মাথায় কলকাতার বাইরে শ্রীরামপুরকেই প্রথম প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য বেছে নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অধুনাপ্রয়াত বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। দেড় দশক পর রাজনৈতিক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে শনিবার সেই শ্রীরামপুর থেকেই নিজের প্রথম জেলা সফর ও রাজনৈতিক সভার সূচনা করলেন সদ্য প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাতা নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সভা হয়েছিল শ্রীরামপুর স্টেশন সংলগ্ন আরএমএস ময়দানে, আর সেখান থেকে মাত্র কয়েকশো মিটার দূরে শ্রীরামপুর কোর্টের মাঠে হাইকোর্টের শর্তসাপেক্ষ অনুমতি নিয়ে জনসভা করলেন মমতা।
‘লাল-নীল-হলুদ না দেখে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন’: মমতার বার্তার নেপথ্যে
জাতীয় স্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা ও ভোটার তালিকায় ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (SIR) নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্কের মাঝে মমতার এই সভা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সম্প্রতি সিপিআইএম (CPIM)-এর সাধারণ সম্পাদক এম এ (মারিয়াম আলেকজান্ডার) বেবি দিল্লির একে গোপালন ভবন থেকে মমতাকে চিঠি পাঠানো এবং টেলিফোনে কথা বলার পর শনিবারের মঞ্চ থেকে মমতা স্পষ্ট বার্তা দেন:
“ইতিমধ্যেই আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রশান্ত ভূষণ, যোগেন্দ্র যাদবের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আমি ইস্যুকে সমর্থন করি। কোন পার্টি, কী কালার—দেখার দরকার নেই। কে লাল, কে নীল, কে হলুদ—তাও দেখার দরকার নেই।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ এই বক্তব্যকে বাম বা অন্যান্য বিরোধী শিবিরের প্রতি মমতার নমনীয় মনোভাব হিসেবে দেখলেও, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম অবশ্য এই জল্পনায় জল ঢেলে জানিয়েছেন, এটি জাতীয় স্তরের ইস্যু, রাজ্য রাজনীতির ক্ষেত্রে এর কোনো প্রভাব বা সমীকরণ বদলের সম্ভাবনা নেই।
জ্ঞানেশ কুমার ও নির্বাচন কমিশনকে বিঁধে আক্রমণ
শ্রীরামপুরের মঞ্চ থেকে নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ফের সুর চড়ান মমতা:
-
‘ভ্যানিশ কুমার’ ও সীমা খান্না: কমিশনের আধিকারিক সীমা খান্না ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার অভিযোগ তুলে মমতা বলেন, “আমরা উকুন বাছার মতো করে এসআইআর করেছিলাম। তাই চুরিটা ধরতে পেরেছি। আমরাই প্রথম নাম দিয়েছিলাম ভ্যানিশ কুমার।”
-
আগামী রণকৌশল: বাংলায় দুর্গাপূজা ও উৎসবের মরশুম মিটে গেলেই তিনি রাজনৈতিকভাবে “আরও একটা দশমী করবেন” বলে ইঙ্গিতপূর্ণ হুঙ্কার দেন।
আরও পড়ুনঃ বেনজির বন্ধুত্ব! ইতিহাস পিছনে রেখে সিপিএমের সঙ্গে কথা মমতার
হাইকোর্টের নির্দেশ ও সভার পরিমণ্ডল
শ্রীরামপুরের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনি প্রচেষ্টায় হাইকোর্ট শর্তসাপেক্ষে সভার অনুমতি দেয়। বিকেল ৪টে থেকে ৬টার সময়সীমা এবং ১,০০০ জনের উপস্থিতির কড়াকড়ি থাকলেও সমাবেশ সময়ের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পুরো সভার ভিডিওগ্রাফি এবং ড্রোন দিয়ে নজরদারি চালানো নিয়ে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, “ওই দেখুন আকাশে ড্রোনের নেত্য হচ্ছে।”
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দেড় দশক আগে ক্ষমতা হারানোর সময় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের দল অখণ্ড থাকলেও, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে সাবেক শাসক দলটির নাম ও প্রতীক আপাতত ফ্রিজ বা স্থগিত অবস্থায় রয়েছে।


