বিশেষ বিনোদন প্রতিনিধি:
পর্দায় ফাঁসির মঞ্চ প্রস্তুত। চারপাশে উন্মুখ জনতার থিকথিকে ভিড়। মৃত্যুর ঠিক মুখোমুখি দাঁড়িয়েও যাঁর চোখেমুখে ছিল না কোনো ভয়ের লেশমাত্র; বরং গলার শিরা ফুলিয়ে, তাচ্ছিল্যের হাসিতে যিনি ছুড়ে দিতেন এক অমোঘ হুঙ্কার— “আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে…”। যাঁর এই একটিমাত্র ডায়লগে প্রেক্ষাগৃহে পিনপতন নীরবতা নেমে আসত, রাগে লাল হওয়া চোখ আর ক্ষুব্ধ মেজাজে মৃত্যুর সঙ্গে চোখে চোখ রেখে লড়াই করার সেই গর্জন আজও কোটি দর্শকের গায়ে কাঁটা দেয়।
কিন্তু বৃহস্পতিবারের নীলচে ভোরটা আর কোনো নতুন সংলাপের সুযোগ দিল না। রূপোলি পর্দায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়া সেই অকুতোভয় মানুষটার বাস্তব জীবনের মৃত্যুটা এল চরম নিঃশব্দে।
গোয়ার শান্ত সকালে যখন ভোরের আলো সবে ফুটছে, ঘড়ির কাঁটায় ঠিক ৫টা ২০ মিনিট। আচমকা তীব্র বুক ব্যথা। তড়িঘড়ি ডোনা পাওলার এক বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই সব শেষ। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল বলিউডের চেনা সেই সিংহগর্জন। মাত্র ৭৫ বছর বয়সে চিরঘুমে পাড়ি দিলেন ‘নটসম্রাট’ নানা পাটেকর। আপাতত গোয়া থেকে তাঁর পার্থিব দেহ মুম্বাই নিয়ে আসার প্রস্তুতি চলছে।
আরও পড়ুনঃ বড় বিপর্যয়! প্রয়াত নানা পাটেকর
জেব্রা ক্রসিং আঁকা থেকে সন্তানশোক: ব্যথার ক্যানভাসে গড়া এক জীবন
মহারাষ্ট্রের মুরুদ-জাঞ্জিরায় জন্ম নেওয়া বিশ্বনাথ পাটেকরকে গোটা বিশ্ব চিনেছিল ‘নানা’ নামে। মারাঠি থিয়েটারের কিংবদন্তি বিজয়া মেহতার হাত ধরে তাঁর অভিনয়ে হাতেখড়ি হলেও, সাফল্যের এই রাজপথ মোটেই সুগম ছিল না।
-
চরম দারিদ্রের সাথে লড়াই: স্যার জে জে স্কুল অফ আর্টসে পড়ার সময় পেটের তাগিদে মুম্বাইয়ের উত্তপ্ত রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং এঁকেছেন, সিনেমার পোস্টার এঁকে দিন চালিয়েছেন।
-
ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি: মাত্র ২৮ বছর বয়সে বাবাকে হারান। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছিল, যখন নিজের চোখের সামনে নিজের মাত্র দুই বছরের আদরের সন্তান দুর্বাসার মৃত্যু দেখেন। স্ত্রী নীলকান্তি পাটেকরের সঙ্গে পরবর্তীতে বৈবাহিক দূরত্ব তৈরি হলেও আজীবন তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও মর্যাদা অটুট ছিল।
বুকের ভেতর জমাট বাঁধা এই পাহাড়প্রমাণ কষ্ট ও কান্নাকে পাথর করে তিনি ঢেলে দিয়েছিলেন অভিনয়ের ক্যানভাসে। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ দিয়ে যা শুরু হয়েছিল, তা পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক স্বর্ণালী অধ্যায় হয়ে ওঠে।
‘পরিন্দা’ থেকে কার্গিল যুদ্ধ: এক বহুমুখী প্রতিভার উপাখ্যান
১৯৮৯ সালে ‘পরিন্দা’ ছবির আন্না শেঠ চরিত্র নানা পাটেকরকে প্রথম এনে দেয় জাতীয় পুরস্কার। এরপর ১৯৯৪ সালে ‘ক্রান্তিবীর’ এবং ১৯৯৭ সালে ‘অগ্নিসাক্ষী’—দুটি ছবিতেই সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় পুরস্কার জিতে নেন তিনি।
চলচ্চিত্রে এই অভূতপূর্ব অবদানের জন্য ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে সম্মানীয় ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে।
আরও পড়ুনঃ বাংলায় নজিরবিহীন সন্ত্রাস! বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্যের বাড়িতে দুষ্কৃতী হামলা
এক কামরার ফ্ল্যাট ও নিঃস্বার্থ ‘নাম ফাউন্ডেশন’
কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েও আভিজাত্যের মোহে পা দেননি তিনি। মুম্বাইয়ের অন্ধেরিতে মাত্র একটি ১-বিএইচকে (1BHK) সাধারণ ফ্ল্যাটে বৃদ্ধা মায়ের সাথেই সাদামাটা জীবন কাটিয়েছেন শেষ দিন পর্যন্ত।
নিজের অর্জিত উপার্জনের সিংহভাগ তুলে দিতেন মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের হাতে। অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সাথে যৌথভাবে তৈরি করেছিলেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’, যার মাধ্যমে বহু আত্মঘাতী কৃষকের পরিবার ও বিধবা নারীদের নতুন করে বাঁচার আলো দেখিয়েছেন তিনি।
ক্যামেরার সামনের চড়া মেজাজের নানা পাটেকরের চেয়েও ক্যামেরার পেছনের সাধারণ মানুষটা ছিলেন অনেক বেশি খাঁটি, মহৎ ও মাটির কাছাকাছি। সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে হয়তো তাঁর অগণিত সংলাপ ভেসে বেড়াবে, কিন্তু রূপোলি পর্দায় ওই রাজকীয় মেজাজে নতুন করে আর কেউ গর্জন করে উঠবে না।
ভাল থাকবেন ‘ক্রান্তিবীর’! চিরবিদায়, সত্যিকারের ‘নটসম্রাট’!


