বিশেষ পরিবেশ ও অর্থনৈতিক প্রতিনিধি, নতুন দিল্লি:
বর্ষার মরশুম বিদায় নিয়ে শীতের আমেজ শুরু হলেও দেশের ভবিষ্যৎ জলবায়ু ও পানীয় জলের পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় আশঙ্কার মেঘ ঘনাচ্ছে। ২০২৬ সালের বর্ষায় দেশজুড়ে স্বাভাবিকের তুলনায় ঘাটতি এবং তার ওপর প্রশান্ত মহাসাগরে নতুন করে এল নিনো (El Nino) অতিমাত্রায় শক্তিশালী হয়ে ওঠায় ভারত এক গভীর জল সঙ্কটের মুখোমুখি হতে চলেছে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। জলাধারগুলিতে জলের মাত্রা তলানিতে ঠেকায় এবং ভূগর্ভস্থ জলের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় আগামী দিনে খরা ও তীব্র জলসঙ্কটের আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
আরও পড়ুনঃ এটাই দেখা বাকি ছিল! জীবিত ভোটারদের তালিকায় ভগৎ সিংয়ের ছবি; হইচই পঞ্জাবে
১. কম বৃষ্টি ও জলাধারে তলানিতে জল
ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার মরশুমে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ১২.৫৬ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের জলভাণ্ডারগুলিতে:
-
জলাধারে ঘাটতি: কেন্দ্রীয় জল কমিশন (CWC)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্ষার শেষে তাদের পর্যবেক্ষণে থাকা ১৭৮টি জলাধারে মোট ১৩২.৭৩৪ বিলিয়ন ঘনমিটার জল মজুত ছিল, যা গত ১০ বছরের গড় মজুত (১৫১.১১৮ বিলিয়ন ঘনমিটার)-এর তুলনায় অনেকটাই কম।
-
রাজ্যভিত্তিক সংকট: মহারাষ্ট্রের বিড় (Beed) জেলার মতো বিভিন্ন অঞ্চলে পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই সংকটজনক। জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর নেমে গেছে এবং পানীয় জলের জন্য ট্যাঙ্কারের ওপর নির্ভরতা বাড়াতে হচ্ছে। তেলেঙ্গানার হায়দরাবাদেও জলাধারে জলের জোগান নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২. গোদের ওপর বিষফোঁড়া শক্তিশালী এল নিনো
আমেরিকার ‘নোয়া’ (NOAA)-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং ২০২৭ সালের গোড়া পর্যন্ত এর প্রভাব বজায় থাকতে পারে।
-
সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার এই ঘটনার সঙ্গে ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর দুর্বলতার সরাসরি যোগ রয়েছে।
-
শীতে রবি ফসলের সেচের জন্য জলের চাহিদা এবং আসন্ন ২০২৭ সালের গরমে তাপমাত্রা বৃদ্ধির জেরে এই জল সঙ্কট ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ‘পুজোর মুখে পকেটে ক্যাঁওমেও!’ পকেট ফাঁকা করতে এবার বাড়ল পেট্রোলের দাম! দামি ডিজেলও
৩. আসল সংকট ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহারে
কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ জল বোর্ডের (CGWB) মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতে বছরে প্রায় ২৪৭.২২ বিলিয়ন ঘনমিটার ভূগর্ভস্থ জল তোলা হয়, যা মোট বার্ষিক উত্তোলনযোগ্য সম্পদের প্রায় ৬০.৬৩ শতাংশ।
-
দেশের প্রায় ৭৩০টি ভূগর্ভস্থ জল মূল্যায়ন ইউনিটকে ‘ওভার-এক্সপ্লয়টেড’ (অতি-উত্তোলিত) বা বিপজ্জনক বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।
-
বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হলে খরা পরিস্থিতিতে মানুষ গভীর নলকূপ ও ভূগর্ভস্থ জলের ওপর ভরসা করে। কিন্তু জলস্তর অতিরিক্ত নেমে গেলে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি গরিব ও প্রান্তিক কৃষকদের চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়তে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশজুড়ে সামগ্রিক খরা পরিস্থিতি অবশ্যম্ভাবী না হলেও, যেসব অঞ্চলে জলস্তর ইতিমধ্যেই সংকটের মুখে, সেখানে আগামী বর্ষার আগেই তীব্র পানীয় জল ও সেচের হাহাকার দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রশাসনিক পরিকল্পনা ও জল সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়ার সময় এসে গেছে।


