Sunday, 25 October, 2026
25 October
HomeকলকাতাLaxmi Puja: কোজাগরী রাতের নতুন ভাবনা! লক্ষ্মী আসুক সবার ঘরে, মেয়ের হাত...

Laxmi Puja: কোজাগরী রাতের নতুন ভাবনা! লক্ষ্মী আসুক সবার ঘরে, মেয়ের হাত ধরে, ছেলের হাত ধরেও

লক্ষ্মী কোনো মেয়ের নাম নয়। লক্ষ্মী একটা স্বভাব।

অনেক কম খরচে ভিডিও এডিটিং, ফটো এডিটিং, ব্যানার ডিজাইনিং, ওয়েবসাইট ডিজাইনিং এবং মার্কেটিং এর সমস্ত রকম সার্ভিস পান আমাদের থেকে। আমাদের (বঙ্গবার্তার) উদ্যোগ - BB Tech Support. যোগাযোগ - +91 9836137343.

চন্দন দাস; বিশেষ সম্পাদকীয় এবং সমাজচিন্তা প্রতিবেদন:

“লক্ষ্মী মেয়ে।”— এই দুটি শব্দ আমাদের সমাজজীবনে এক চিরন্তন ছাঁচ। যে মেয়েটি ঘরের কোণে শান্ত হয়ে থাকে, জোরে হাসে না, মুখে মুখে তর্ক করে না, সূর্য ওঠার আগে ঘুম থেকে উঠে সবার শেষে থালাটি হাতে তুলে নেয়, সমাজ তাকেই ‘লক্ষ্মী’ তকমা দেয়। কিন্তু প্রশংসার মোড়কে মোড়া এই সুন্দর শব্দটির আড়ালে আদতে লুকিয়ে থাকে এক আজীবন অদৃশ্য দায়িত্বের পাহাড়, যা নামিয়ে রাখার বা একটু দম নেওয়ার অধিকারটুকুও তাকে কেউ দেয় না।

পরিসংখ্যানও এই সামাজিক লিঙ্গবৈষম্যের নির্দয় ছবিটাই তুলে ধরে। কেন্দ্রীয় সরকারের ‘টাইম ইউজ সার্ভে ২০২৪’ (Time Use Survey 2024)-এর তথ্য বলছে, এই দেশে একজন মহিলা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিনা পারিশ্রমিকে সংসারের অদৃশ্য কাজে সময় দেন, অথচ পুরুষদের ক্ষেত্রে সেই গড় সময় দেড় ঘণ্টারও কম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যে রাজ্যগুলিতে পুরুষদের গৃহস্থালির কাজে হাত লাগানোর হার সবচেয়ে কম, সেই তালিকার প্রথম সারিতেই রয়েছে আমাদের এই পশ্চিমবঙ্গের নাম।

কিন্তু সমাজ যখন চিরকাল ধরে ‘লক্ষ্মী’ শব্দটিকে কেবল মেয়েদের ঘাড়েই একতরফা দায়িত্ব হিসেবে চাপিয়ে দিয়েছে, তখন ইতিহাস ও বর্তমান সাক্ষী রয়েছে— এমন কিছু মানুষ ছিলেন এবং আছেন, যাঁদের প্রকৃত অর্থে ‘লক্ষ্মী’ ছাড়া আর অন্য কোনো বিশেষণে ভূষিত করা চলে না।

আরও পড়ুনঃ  ‘জয় তারা, জয় তারা’; আজ শুক্লা চতুর্দশী, মা তারার আবির্ভাব দিবস

উনিশ শতক থেকে আজকের পথ চলা

গল্পটা শুরু হতে পারে উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক কলকাতা থেকে। তখন মেয়েদের লেখাপড়া শেখাটাই ছিল সমাজের চোখে ঘোর “অলক্ষুণে”। সেই প্রতিকূল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় বিয়ে করলেন তাঁরই ছাত্রী কাদম্বিনীকে। সমাজের রক্ষণশীল আত্মীয়স্বজন মুখ ফিরিয়ে নিল, এমনকি বহুদিনের প্রিয় বন্ধুরাও সেই বিয়েতে উপস্থিত থাকতে সাহস পেলেন না। কিন্তু দ্বারকানাথ থমকে দাঁড়াননি। স্ত্রীর চিকিৎসাবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা ও মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য তিনি তৎকালীন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। ফলস্বরূপ, কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় হয়ে উঠলেন দেশের অন্যতম প্রথম প্র্যাকটিসিং মহিলা চিকিৎসক।

পরবর্তী সময়ে রাতের পর রাত জেগে রোগী দেখতে যাওয়ার মতো মানবিক কাজ করায় সেকালের “বঙ্গবাসী” পত্রিকা তাঁকে এক কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেছিল। কিন্তু দ্বারকানাথ চুপ থাকেননি; সম্পাদককে সোজা আদালতে টেনে নিয়ে গিয়ে তাঁর ছ’মাসের জেলের সাজা নিশ্চিত করেছিলেন। স্ত্রীর আত্মসম্মান ও কাজের পাশে এভাবেই দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা— সেটাও তো নিখাদ ‘লক্ষ্মী’রই কাজ!

ক্রিকেট পিচ থেকে পিতৃত্বের দায়িত্ব

সেই ঘটনার প্রায় সোয়াশো বছর পরেও লিঙ্গসাম্য নিয়ে লড়াইয়ের চেহারাটা খুব একটা বদলায়নি। ২০২০ সাল। অস্ট্রেলিয়া সফরের মাঝপথে সিরিজ ছেড়ে ভারতে ফিরে আসেন তৎকালীন ভারত অধিনায়ক বিরাট কোহলি। কারণ একটাই— প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসছে, সেই বিশেষ মুহূর্তে স্ত্রীর পাশে থাকতে চান তিনি। তিনি টানা তিনটে টেস্ট ম্যাচ খেললেন না। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে শুরু হলো তীব্র ট্রোল— “দেশের চেয়ে কি তবে বউ বড়?”

কিন্তু কেউ কি একবারও প্রশ্ন তুলেছিল, একজন মা যখন সন্তানের জন্মের জন্য নিজের কেরিয়ার বা চাকরি ছাড়েন, তখন কি কেউ বলে “দেশের চেয়ে সন্তান বড়?” সবচেয়ে মজার এবং ইতিবাচক বিষয় হলো, সেই ছুটি মঞ্জুর করেছিলেন তৎকালীন বিসিসিআই সভাপতি, আমাদেরই বাংলার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। যিনি নিজে ২০০১ সালে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজের মাঝে সদ্যোজাত মেয়ে সানাকে দেখার জন্য একমাসেরও বেশি সময় কাছে যেতে পারেননি। হয়তো নিজের সেই না-পাওয়া ও আক্ষেপের বেদনাটা তিনি গভীরভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন বলেই আরেকজন তরুণ বাবাকে তাঁর দায়িত্ব পালন থেকে আটকাননি।

এককাধে সংসার ও মানবতার দূত

কেউ কেউ আবার নিখাদ ভালোবাসায় সংসারের সমস্ত ঝড়ঝাপটা একা কাঁধে তুলে নেন। বলিউডের প্রখ্যাত পরিচালক করণ জোহর সারোগেসির মাধ্যমে যমজ সন্তানের সিঙ্গল ফাদার হয়েছেন। ছেলের নাম রেখেছেন তাঁর প্রয়াত বাবার নামে, আর মেয়ের নাম রেখেছেন মায়ের নামের অক্ষর উল্টে। একা হাতে সন্তান মানুষ করছেন তিনি, আর রোজকার যাপনে ভেঙে দিচ্ছেন সেই পুরনো পিতৃতান্ত্রিক ধারণা— যা বলে, মা ছাড়া নাকি সংসার অসম্পূর্ণ থাকে।

অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের চা-বাগানের দিকে তাকালে দেখা মিলবে করিমুল হকের মতো মানুষের। অ্যাম্বুলেন্সের অভাবে চোখের সামনে মায়ের প্রয়াণ দেখেছিলেন তিনি। সেই মর্মান্তিক যন্ত্রণা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের ভাঙা বাইকটাকেই বানিয়ে ফেললেন মুমূর্ষু মানুষের ‘অ্যাম্বুলেন্স’। আজ তিনি পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত, সাধারণ মানুষের কাছে তিনি “বাইক অ্যাম্বুলেন্স দাদা”। নিজের মাকে বাঁচাতে পারেননি, তাই আজও এক বুক দায়িত্ববোধ নিয়ে অন্যের মাকে বাঁচিয়ে চলেছেন তিনি।

এমন মানুষ কি আমাদের পাড়ায় নেই? যে বাবা ভোরের আলো ফোটার আগেই ছোট্ট মেয়ের মাথার চুল নিখুঁত করে বেঁধে স্কুলে পাঠিয়ে দেন, বা যে স্বামী অফিস থেকে ক্লান্ত হয়ে ফেরা স্ত্রীর জন্য রাতে নিজে হাতে গরম ভাতটুকু বসিয়ে রাখেন— তাঁদের নিয়ে পাড়াপড়শি হয়তো আড়ালে হাসাহাসি করে বলে, “ছেলেটা বউয়ের কথায় চলে।” কিন্তু সেই ‘বউয়ের কথা শোনা’ মানুষগুলোই তো আসলে সংসারের আসল স্তম্ভ।

আরও পড়ুনঃ  যে প্রতিশ্রুতির বাঁধনে দেবী লক্ষ্মী আজও বন্দি! জগৎ শেঠ ও পদ্মাবতীর সেই অমলিন কোজাগরী কথা

কোজাগরী রাতের নতুন অর্থ

আজ কোজাগরী পূর্ণিমা। ‘কো জাগর্তি’ বা কে জেগে আছে? লোককথা বলে, এই শরৎতের জাদুকরী রাতে মা লক্ষ্মী মর্ত্যে ঘরে ঘরে ঘুরে দেখেন কে জেগে রয়েছে।

এবার যদি মা লক্ষ্মী এসে দেখেন, কান্নায় ভেঙে পড়া ছোট্ট শিশুকে কোলে নিয়ে বাড়ির বাবাটা ক্লান্ত চোখে বারান্দায় পায়ে হেঁটে চলেছেন, তিনি কি ফিরে যাবেন? কক্ষনো না। বরং তিনি মৃদু হেসে আশীর্বাদ করবেন। কারণ, ‘লক্ষ্মী’ কোনো নির্দিষ্ট লিঙ্গ বা মেয়ের নাম নয়। লক্ষ্মী হলো একটি স্বভাব— যত্নের, পরিপক্ব দায়িত্ববোধের এবং নিবিড় ভালোবাসার। সে স্বভাব শুধু মেয়েদের একপেশে ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার নিঃশব্দ বোঝা নয়, বরং তা দু’হাতে ভাগ করে নেওয়ার অনাবিল আনন্দ।

আজ কোজাগরী পূর্ণিমার এই স্নিগ্ধ আলোয় প্রার্থনা একটাই— সমাজের সমস্ত কুসংস্কার ও লিঙ্গভেদের দেয়াল ভেঙে লক্ষ্মী আসুক সকলের ঘরে। শুধু মেয়ের হাত ধরে নয়, সমানভাবে ছেলের হাত ধরেও। শুভ কোজাগরী পূর্ণিমা ও লক্ষ্মীপুজো।

এই মুহূর্তে

আরও পড়ুন