বিশেষ জাতীয় রাজনীতি সংক্রান্ত প্রতিবেদন:
কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক ও দলীয় সমীকরণ নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনা তৈরি হলো। রবিবার দিল্লির ঐতিহ্যবাহী রামলীলা ময়দানে বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ (INDIA) জোটের হাই-প্রোফাইল জনসভায় বক্তা তালিকায় স্থান পাননি প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভাদ্রে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কংগ্রেস ও গান্ধী পরিবারের অন্দরে সংঘাতের অভিযোগ তুলে সুর চড়িয়েছে শাসকদল বিজেপি। বিজেপির দাবি, রাজনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে বোন প্রিয়াঙ্কাকে পিছনের সারিতে ঠেলে দিচ্ছেন ‘দাদা’ রাহুল গান্ধী।
১. রামলীলা ময়দানে রাহুলের ‘ভোটচুরি’ তোপ ও নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
রবিবার দিল্লির রামলীলা ময়দানে বিরোধী জোটের যৌথ সমাবেশে মূল বক্তা হিসেবে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে কড়া আক্রমণ শানান কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
-
এসআইআর ও ভোটার বাদ পড়া: সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাহুল অভিযোগ করেন, সামারি রিভিশন বা এসআইআর (SIR)-এর নামে দেশের প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে ছাঁটাই করা হয়েছে। অর্থাৎ, দেশের প্রতি সাতজন ভোটারের মধ্যে একজনকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
-
নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন: রাহুল পরিসংখ্যান দিয়ে দাবি করেন, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী এনডিএ এবং বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মধ্যে ভোটের পার্থক্য ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। ফলে সাড়ে ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়ার হিসাব তুলে ধরে তিনি অভিযোগ করেন, ২০২৪-এ এনডিএ-র জয় এবং নরেন্দ্র মোদীর পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্পূর্ণ ‘বেআইনি’ ও ‘মিথ্যা’।
২. বিজেপির পাল্টা তোপ: প্রিয়াঙ্কার ‘ভোটচুরি’ করেছেন রাহুল
রামলীলা ময়দানের এই সভার পর রাহুল গান্ধীকে তীব্র ভাষায় পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিজেপি মুখপাত্র সম্বিত পাত্র। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে বক্তব্য রাখতে না দেওয়াকে হাতিয়ার করে তিনি গান্ধী পরিবারের অন্দরে ফাটলের তত্ত্ব সামনে আনেন।
-
‘পরিবারের অন্দরেই ভোটচুরি’: সম্বিত পাত্র কটাক্ষ করে বলেন, দেশের ভোটের হিসাব দেওয়ার আগে রাহুলের বোঝা উচিত যে গান্ধী পরিবারের অন্দরে খোদ প্রিয়াঙ্কার ‘ভোটচুরি’ হয়ে গিয়েছে।
-
নকল সংসদ ও রামলীলার অভিজ্ঞতা: বিজেপি মুখপাত্র দাবি করেন, এর আগে রাহুলের উদ্যোগে আয়োজিত কংগ্রেসের ‘নকল সংসদ’-এ বহু অ-সাংসদ বক্তব্য রাখার সুযোগ পেলেও প্রিয়াঙ্কাকে বলতে দেওয়া হয়নি। ঠিক একইভাবে রামলীলা ময়দানের বিশাল জনসভাতেও সবাইকে বলতে দেওয়া হলেও প্রিয়াঙ্কাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। দুটি কর্মসূচীতেই প্রিয়াঙ্কাকে প্রকাশ্যে অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ দেখাচ্ছিল বলে দাবি করেন সম্বিত।
-
নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ: বিজেপির তোপ, প্রিয়াঙ্কা যদি মূল ধারার রাজনীতিতে বড় মুখ হিসেবে উঠে আসেন, তবে রাহুলের গুরুত্ব ও একছত্র আধিপত্য কমে যেতে পারে—এই আশঙ্কা ও নিরাপত্তাহীনতা থেকেই প্রিয়াঙ্কাকে চেপে রাখার চেষ্টা করছেন রাহুল। ফলে দলে দুটি পৃথক শিবিরের সৃষ্টি হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ লাদাখে মদ নিষিদ্ধের দাবি, অথচ সোনমের পরিবারেই অবৈধ ওয়াইন ব্যবসা!
৩. রাহুল-প্রিয়াঙ্কা রসায়ন: সংঘাতের জল্পনা বনাম স্নেহের ইতিহাস
বিজেপি এই ঘটনাকে ‘ভাই-বোনের ক্ষমতার লড়াই’ হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও, রাজনীতির ময়দানে রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার সমীকরণ বরাবরের জন্য আলাদা।
-
অন্যান্য বহু রাজনৈতিক পরিবারে ক্ষমতা দখলকে কেন্দ্র করে ভাই-বোনের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা গেলেও, রাহুল-প্রিয়াঙ্কার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে সর্বদা গভীর সৌহার্দ্য ও ঐক্যের ছবিই দেখা গেছে।
-
জনসভা কিংবা মিছিলে স্নেহের আলিঙ্গন ও একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর দৃশ্য বারবার ক্যামেরাবন্দী হয়েছে। সাম্প্রতিক অতীতে রাহুলের জার্মানি সফর নিয়ে বিজেপি তোপ দাগলে প্রিয়াঙ্কা যেভাবে দাদার সমর্থনে ময়দানে নেমেছিলেন, ঠিক তেমনই সংসদে ‘বন্দে মাতরম’ বিতর্ক থেকে শুরু করে নানা ইস্যুতে বোন প্রিয়াঙ্কার ভাষণের প্রকাশ্যে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন রাহুল গান্ধী।
তবে রামলীলা ময়দানের সভায় প্রিয়াঙ্কার অনুপস্থিতি বা নীরবতা কেবল বিরোধীদের আক্রমণের অস্ত্রই তুলে দিল না, বরং কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দলীয় বিন্যাস নিয়েও নতুন আলোচনার জন্ম দিল।


