বিশেষ সাংস্কৃতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিবেদন:
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে উৎসবের রূপ, প্যান্ডেলের জৌলুস এবং প্রতিমা তৈরির শৈল্পিক ভাবনাও। কিন্তু নস্টালজিয়ায় মোড়া এই পরিবর্তনে পুরনো দিনের অনেক শহরের বাসিন্দার বুকেই জমেছে এক অদৃশ্য দীর্ঘশ্বাস। ১৯৬8 সালের জগদ্ধাত্রী পুজোর স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের পুজোর তুলনা টানলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে শিল্পকলা ও ভক্তিবাদ উভয় ক্ষেত্রেরই এক বিরাট রূপান্তর—যেখানে হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো দিনের সেই অনুপাত বা ‘অ্যানাটমি’ এবং প্রবেশ করছে আধুনিক নামকরণের হরেক ট্রেন্ট।
আরও পড়ুনঃ বিপদের পর বিপদ নেপালে; অবতরণের সময় দুই কপ্টারের সংঘর্ষ! দুর্ঘটনায় মৃত্যু ১ পর্যটকের
১. প্রতিমার অ্যানাটমি: ‘সঠিক অনুপাত’ বনাম ‘দৈত্যাকার রূপ’
পুরনো দিনের প্রতিমার গঠনশৈলী নিয়ে আলোচনা করলে দুটি প্রধান তফাত চোখের সামনে ভেসে ওঠে:
-
আদর্শ মাপের সামঞ্জস্য: ১৯৬৮ সালের জগদ্ধাত্রী মূর্তিগুলির দিকে তাকালে দেখা যাবে, দেবীর মুখাবয়ব, হাত ও পায়ের মাপের সামঞ্জস্য বা অ্যানাটমি ছিল নিখুঁত। প্রতিমার শারীরিক অনুপাতে এক অপূর্ব ভারসাম্য রক্ষা করা হতো।
-
সিংহের রূপান্তর: সেকালে মৃৎশিল্পীরা দেবীর মুখশ্রী ফুটিয়ে তুলতে সিদ্ধহস্ত হলেও সিংহ নির্মাণে কিছুটা হলেও কাঁচি বা ত্রুটি থেকে যেত। কিন্তু বর্তমানের প্রতিমাগুলোতে আকারে ‘বিশালত্ব’ আনার প্রতিযোগিতায় সেই মূল অ্যানাটমি বা শারীরিক অনুপাত অনেকটাই হারিয়ে গেছে। মুখশ্রী আধুনিকতার ছোঁয়ায় সুন্দর হয়ে উঠেছে বটে, তবে তা অনেক ক্ষেত্রেই দেবীর ঐশ্বরিক রূপের চেয়ে মানবীয় রূপ ধারণ করেছে।

আরও পড়ুনঃ লাদাখে মদ নিষিদ্ধের দাবি, অথচ সোনমের পরিবারেই অবৈধ ওয়াইন ব্যবসা!
২. ‘মা জগদ্ধাত্রী’ থেকে ‘রানিমা-মিষ্টিমা’: নামকরণের নতুন ট্রেন্ড
পুজো ঘিরে সাম্প্রতিককালের সবথেকে বড় সামাজিক পরিবর্তন হলো প্রতিমার নামকরণের ধুম।
-
আত্মীয়সূচক নামের বাড়বাড়ন্ত: আজকাল চন্দননগর বা কৃষ্ণনগর সহ বিভিন্ন জায়গার বড় পুজোয় জগদ্ধাত্রী প্রতিমা বা ডাকের সাজের মূর্তিদের বিভিন্ন আদুরে নামে ভূষিত করা হয়—যেমন ‘রানিমা’, ‘গিন্নিমা’, ‘মিষ্টিমা’, ‘দুষ্টু মা’, ‘কিউট মা’ ইত্যাদি। ট্রেন্ডের বহরে ভবিষ্যতে এই তালিকা কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন প্রবীণরা।
-
আদি মায়ের ঐতিহ্য: অতীতে এহেন আত্মীয়সূচক নাম দেওয়ার চল ছিল না বললেই চলে। বহু বছর আগে একমাত্র ‘আদি মা’ ছাড়া এই ধরনের পারিবারিক বা আত্মীয়তার মোড়কে দেবীকে ডাকার চল ছিল না। ভক্তরা ভালোবেসে, দেবীকে আরও আপন করে পাওয়ার আস্বাদেই এই নামগুলো দিয়ে থাকতে পারেন। তবে পুরোনো দিনের মানুষের কাছে দেবী সর্বদাই ধরাছোঁয়ার বাইরে, সবার মা—যাঁকে মাথা উঁচু করে ভক্তিভরে দেখতে হয়। সেই জায়গায় ‘কাকিমা, জ্যেঠিমা, মাসিমা’ সূচক নামগুলো অনেক প্রবীণ ও ঐতিহ্যপ্রেমী মানুষের কাছেই বড্ড বেমানান ঠেকে।
কালের নিয়মে শিল্পকলা এবং ভক্তির প্রকাশে আধুনিকতা আসলেও, শেকড়সন্ধানী মানুষেরা আজও সেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা মহিমান্বিত ‘মা জগদ্ধাত্রী’-র রূপ ও আভিজাত্যকেই হৃদয়ে ধারণ করে চলেছেন।


