বিশেষ আন্তর্জাতিক ও অর্থনৈতিক সংবাদ প্রতিবেদন:
নিজের দেশে প্রথম ‘ইউনিকর্ন’ সংস্থা গড়ার স্বপ্ন এবং প্যারাগুয়ের কোনো সংস্থাকে প্রথমবার নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত করার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ধূসর হয়ে গেল এক রাতের ব্যবধানে। লাতিন আমেরিকার অন্যতম দরিদ্র দেশ প্যারাগুয়েতে এক নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয় ও রাজনৈতিক সংকটে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। তীব্র তারল্য সংকটের জেরে দেশটির অন্যতম বৃহৎ ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো ব্যাংক’ (Ueno Bank) বন্ধ করে দিয়েছে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই কেলেঙ্কারির জেরে কারাগারে যেতে হয়েছে ব্যাংকটির কর্ণধার তথা ৩৬ বছর বয়সি তরুণ ব্যাঙ্কার মিগুয়েল ভাজকেজকে (Miguel Vázquez) এবং রাজনৈতিক চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা (Santiago Peña)।
১. উয়েনো ব্যাংকের পতন ও তরুণ ব্যাঙ্কার মিগুয়েল ভাজকেজের উত্থান-পতন
-
পারিবারিক ব্যবসা থেকে আকাশচুম্বী সাফল্য: মিগুয়েল ভাজকেজের ব্যবসার ভিত তৈরি হয়েছিল তাঁর পরিবারে। ছোটবেলায় দাদার মুদির দোকান ও বাবার ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসা ‘Credicentro’-কে আধুনিক রূপ দিয়ে ২০২৩ সালে তিনি ‘উয়েনো ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করেন। দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করা এই ব্যাংকটির সঙ্গে প্যারাগুয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ যুক্ত ছিলেন। ২০২৫ সালে এটি দেশের জাতীয় ফুটবল দলের স্পনসরও হয়।
-
মূল্যায়ন ও পতন: চলতি বছরের গোড়ায় উয়েনো ব্যাংকের মূল্যায়ন প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল এবং ভাজকেজের ব্যক্তিগত সম্পত্তির পরিমাণও আকাশছোঁয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপে ব্যাংকটি বন্ধ হওয়ার পর বর্তমানে বিচার-পূর্ব হেফাজতে (Pre-trial detention) জেলের দিন কাটাচ্ছেন ভাজকেজ।
২. প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার পদত্যাগ ও রাজনৈতিক সংকট
-
অভিশংসন প্রক্রিয়া ও সরকারি আমানত: উয়েনো ব্যাংকের সঙ্গে সরকারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের জেরে প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন আইনপ্রণেতারা। অভিযোগ ওঠে, পেনার প্রশাসন পতনমুখী ওই ব্যাংকে ৮০০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি সরকারি অর্থ (যা দেশের মোট সরকারি সঞ্চয়ের প্রায় ২০ শতাংশ) জমা রেখেছিল। প্যারাগুয়ের ইতিহাসে কোনো ব্যাংকে সরকারি আমানতের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি রেকর্ড পরিমাণ।
-
পেনার পদত্যাগ: ভোটাভুটির আগেই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়ে পেনা এক ভিডিও বার্তায় জানান, তাঁর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া। ব্যাংকটির লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষেত্রেও স্বজনপোষণের অভিযোগ উঠেছিল, কারণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যে প্রধান লাইসেন্স দিয়েছিলেন, তিনি অতীতে ভাজকেজের হয়েই কাজ করতেন। চাপের মুখে তাঁকেও পদত্যাগ করতে হয়েছে।
৩. সাধারণ মানুষ থেকে ফুটবলারদের চরম দুর্গতি
-
আমানতকারীদের অনিশ্চয়তা: ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লক্ষ লক্ষ সাধারণ নাগরিক ও সরকারি সংস্থা তাদের অ্যাকাউন্টে থাকা অর্থে প্রবেশাধিকার হারিয়েছেন। প্যারাগুয়ের আমানত বিমা ব্যবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৮ হাজার ডলার পর্যন্ত সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকলেও, বাকি বিপুল পরিমাণ অর্থের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
-
জাতীয় ফুটবল দলের বিপত্তি: উয়েনো ব্যাংক বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়েছে প্যারাগুয়ের জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়দের ওপরেও। দলের অধিনায়ক গুসতাভো গোমেজসহ ফুটবলাররা যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাঁরাও এই সংকটের শিকার এবং তাঁদের সঞ্চিত অর্থও ব্যাংকে আটকে রয়েছে।
আরও পড়ুনঃ সামশেরগঞ্জে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের মেগা স্ট্রাইক; ৬,৩২৬ পিস ‘ইয়াবা’ ট্যাবলেটসহ গ্রেফতার পাচারকারী
৪. বিলাসবহুল জীবনযাপন থেকে জেলের অন্ধকার
গুগলের অফিসের আদলে তৈরি আসুসিওন-এর যে সদর দফতরটি ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ নামে পরিচিত ছিল এবং যেখানে শীর্ষ কর্তাদের জন্য ব্যক্তিগত রাঁধুনি ও বাটলারের ব্যবস্থা ছিল, তা আজ স্তব্ধ। আয়রনম্যান প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া, গাড়ি রেসিং এবং বিলাসবহুল স্পোর্টস কার সংগ্রহের শখ থাকা মিগুয়েল ভাজকেজ একসময় বলতেন, “আমি গতি ভালোবাসি, রেসিং ভালোবাসি।” কিন্তু সেই অন্ধ গতির দৌড়েই পতন ঘটল তাঁর স্বপ্নের সাম্রাজ্যের এবং তার জেরে চরম রাজনৈতিক ও আর্থিক অস্থিরতার মুখে পড়ল পুরো প্যারাগুয়ে রাষ্ট্র।


