পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটগ্রহণের ঠিক মুখে পাহাড়ে এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছিলো। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ (GTA)-এর বিরুদ্ধে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ‘চানা ডাল’ কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলেছে পাহাড়ি রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্ট (IGJF)।
জনশক্তি ফ্রন্টের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকারের একটি ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য প্রকল্পের আওতায় বরাদ্দ হওয়া হাজার হাজার মেট্রিক টন ডাল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি, বরং মাঝপথেই তা গায়েব করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনের ঠিক দুই দিন আগে এই বিস্ফোরক অভিযোগ ঘিরে শোরগোল পড়ে গিয়েছিলো উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে।
আরও পড়ুনঃ ‘এ বার পরিবর্তন করেই ছাড়তে হবে’, পশ্চিমবঙ্গে ভোটপ্রচার শেষে মোদীর অডিয়োবার্তা
ইন্ডিয়ান গোর্খা জনশক্তি ফ্রন্টের নেতা ফিনজো ওয়াংয়াল গুরুং গত ২১ এপ্রিল এক সাংবাদিক সম্মেলনে তথ্যের অধিকার আইনে (RTI) পাওয়া কিছু নথি পেশ করেন। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকার ‘ভারত ব্র্যান্ড’ প্রকল্পের সূচনা করেছিল যাতে সাধারণ মানুষকে আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি থেকে স্বস্তি দেওয়া যায়।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কেজি প্রতি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় ডাল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কথা ছিল। ফিনজো গুরুংয়ের দাবি, জিটিএ কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্পের আওতায় ৪৫,০০০ মেট্রিক টন চানা ডাল চেয়ে আবেদন করেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় উপভোক্তা বিষয়ক মন্ত্রক ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ১৪,০০০ মেট্রিক টন ডাল বরাদ্দ করে। কিন্তু অভিযোগ হলো, এই বিশাল পরিমাণ ডালের কোনো হদিশ পাহাড়ের রেশন দোকান বা ডিস্ট্রিবিউশন সেন্টারে পাওয়া যায়নি। খোলা বাজারে এই ডালের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০০ কোটি টাকা।
এই অভিযোগের সবথেকে বিতর্কিত দিকটি হলো ডাল বণ্টনের প্রক্রিয়া। সাধারণত এই ধরনের সরকারি প্রকল্পের কাজ নাফেড (NAFED) বা এনসিসিএফ (NCCF)-এর মতো সমবায় সংস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। কিন্তু আরটিআই নথির ভিত্তিতে আইজিজেএফ অভিযোগ করেছে যে, জিটিএ কোনো এক অজ্ঞাত কারণে ‘জীবশক্তি প্রোডাক্টস প্রাইভেট লিমিটেড’ (JeevShakti Products Pvt. Ltd.) নামক একটি বেসরকারি সংস্থাকে এই প্রকল্পের নোডাল এজেন্সি হিসেবে নিয়োগ করেছিল। এই বেসরকারি সংস্থাই বাফার স্টক থেকে ডাল তোলা, প্রসেসিং, প্যাকেজিং এবং বণ্টনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব পেয়েছিল। এমনকি সরকারি সংস্থার বদলে এই বেসরকারি কোম্পানিটিই জিটিএ-এর হয়ে নাফেড-কে সরাসরি অর্থ প্রদান করেছিল বলে নথিতে দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সংস্থাটি প্রায় ২.২৫ কোটি টাকা অগ্রিম জমা দিয়েছিল বলেও জানা গিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, দুর্নীতির এই অভিযোগে বেশ কিছু নির্দিষ্ট নামও উঠে এসেছে। আইজিজেএফ-এর দাবি অনুযায়ী, সঞ্জু ছেত্রী নামের এক ব্যক্তি, যিনি নিজেকে জিটিএ-এর ‘উপদেষ্টা’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখতেন, তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত রহস্যজনক। অভিযোগ উঠেছে যে, প্রশাসনিক নিয়ম লঙ্ঘন করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখেই জিটিএ সরাসরি কেন্দ্রের সঙ্গে এই ডাল সংক্রান্ত লেনদেন চালাচ্ছিল। সাধারণত যেকোনো রাজ্যস্তরের প্রকল্পের কাজ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে সেই নিয়ম মানা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এমনকি জিটিএ-এর প্রধান সচিব বা পদস্থ আধিকারিকদেরও অনেক ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছিল বলে নথিতে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বিস্ফোরক দাবি পুলিশ রিপোর্টে! মিতালির উপর হামলা ‘সাজানো ঘটনা’
নির্বাচনী আবহে এই অভিযোগ দার্জিলিং, কালিম্পং এবং কার্শিয়াং-এর রাজনৈতিক সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, যদি ডাল বরাদ্দ হয়ে থাকে এবং তার জন্য টাকাও মেটানো হয়ে থাকে, তবে সেই ডাল পাহাড়ের সাধারণ মানুষ কেন পেলেন না? ফিনজো ওয়াংয়াল গুরুং সরাসরি জিটিএ নেতৃত্বের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। যদিও জিটিএ কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা আত্মপক্ষ সমর্থন করে কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এই কেলেঙ্কারি নিয়ে জনমানসেও তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ হওয়া ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যদি সত্যিই এমন কোনো নয়ছয় হয়ে থাকে, তবে তা পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকারে বড়সড় আঘাত। পাহাড়ের মানুষ যখন জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে জেরবার, তখন এই ধরনের কয়েকশো কোটির দুর্নীতির খবর ভোটের বাক্সে কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নির্বাচনের ঠিক আগে এই আরটিআই রিপোর্ট ফাঁস হওয়া জিটিএ-এর বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর জন্য বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সব মিলিয়ে, ভারত ব্র্যান্ডের ‘চানা ডাল’ এখন পাহাড়ের রাজনীতির সবথেকে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।


