চন্দন দাস, কলকাতাঃ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে যে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে, তা কেবলই তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরে এক সাধারণ ‘বিদ্রোহ’ নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এবং সাম্প্রতিক কিছু কাঠামোগত রদবদল একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও যুক্তিগ্রাহ্য তত্ত্বকে সামনে নিয়ে আসছে: “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করতে অত্যন্ত সুকৌশলে নেপথ্য থেকে এই ‘বিদ্রোহী’ বিধায়ক ও সাংসদদের ‘প্রশ্রয়’ দিচ্ছেন।”
প্রকাশ্যে তৃণমূল কংগ্রেস এটিকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দাবি করলেও, গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে এই তত্ত্বের সপক্ষে অত্যন্ত জোরালো কিছু যুক্তি উঠে আসে।
দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের অন্দরে ‘ওল্ড গার্ড’ (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র অনুগামী প্রবীণ নেতা) এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘তরুণ ব্রিগেড’-এর মধ্যে এক অদৃশ্য ক্ষমতার লড়াই চলছে।
আরও পড়ুনঃ ‘CPIM-র খুন-ধর্ষণের সংস্কৃতি, সেই দলেরই প্রোডাক্ট ঋতব্রত’, শো-কজের বন্যা মমতাদের
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় বা কাকলি ঘোষ দস্তিদারের মতো প্রবীণ নেতাদের নেতৃত্বাধীন একটি বড় অংশকে যদি ‘বিদ্রোহী’ হয়ে আলাদা ফ্রন্ট গড়ার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে দলের অন্দরে তরুণ নেতৃত্বের একচ্ছত্র প্রভাব অনেকটাই থিতিয়ে পড়ে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই দলের একমাত্র এবং অবিসংবাদিত বিকল্প হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রাখলেন। এর ফলে দলের অন্দরে সময়ের আগেই ব্যাটন হস্তান্তরের প্রক্রিয়া থমকে গেল এবং তিনি নিজের ইচ্ছেমতো দলের যুব বা মহিলা ফ্রন্টের মতো বিভিন্ন উইং পুনর্গঠন করার সুযোগ পেয়ে গেলেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির কাছে পরাজয়ের পর তৃণমূল কংগ্রেসের ভাবমূর্তি এক বড়সড় সংকটের মুখে পড়েছিল।
যদি তৃণমূল কংগ্রেস মমতার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা সত্ত্বেও এই পরাজয় ঘটত, তবে তার দায় সরাসরি নেত্রীর ওপরই বর্তাত। কিন্তু ২০ জনেরও বেশি সাংসদ এবং বহু বিধায়কের এই আকস্মিক ‘বিদ্রোহ’ একটি বিকল্প ন্যারেটিভ তৈরির সুযোগ করে দিল—পরাজয় মমতার নীতির জন্য হয়নি, হয়েছে দলের ভেতরের ‘ঘরের শত্রু’ বা ট্রোজান হর্সদের জন্য।
এর মাধ্যমে তিনি জনমানসের ক্ষোভ নিজের ওপর থেকে সরিয়ে নিতে সক্ষম হলেন। রাজনৈতিক ময়দানে তিনি নিজেকে একজন ‘প্রতারিত নেত্রী’ হিসেবে তুলে ধরে সাধারণ মানুষের সহানুভূতি অর্জন এবং তৃণমূল স্তরে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর ভিত প্রস্তুত করার সুযোগ পেলেন।
বিদ্রোহী শিবিরের যে অংশটি ‘ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI)-র সাথে হাত মিলিয়েছে, তাদের মূল দাবি—তারা বাংলার কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলি আনার জন্য এনডিএ-র সাথে কাজ করতে চায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি নিজে সরাসরি বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র কাছাকাছি যান, তবে বাংলার বুকে তার নিজস্ব ভোটব্যাংক সম্পূর্ণ ধসে পড়বে।
নিজের বিশ্বস্ত প্রবীণ নেতাদের ‘বিদ্রোহী’ ‘সাজিয়ে’ এনডিএ শিবিরে পাঠানোর মাধ্যমে তিনি দিল্লির অলিন্দে একটি পরোক্ষ যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখলেন। এর ফলে একদিকে যেমন কেন্দ্রীয় এজেন্সির তীব্র চাপ থেকে দলকে বাঁচানো সম্ভব, অন্যদিকে তেমনই নিজের ‘বিজেপি-বিরোধী’ ভাবমূর্তিতে কোনো দাগ না লাগিয়েই আড়াল থেকে রাজ্যের স্বার্থে দরকষাকষি চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
মহারাষ্ট্রের রাজনীতির ধাঁচে এই বিদ্রোহী শিবিরও এখন নিজেদের ‘আসল তৃণমূল কংগ্রেস’ বলে দাবি করতে শুরু করেছে।
আরও পড়ুনঃ ‘বিশ্বাস বিশ্বাসঘাতক’; মমতাকে ‘গোল’ দিয়ে মেসিকেও পিছনে ফেলে দিলেন অরূপ
যদি এই ভাঙন, আড়াল থেকে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে, তবে এটি আসলে একটি সুদূরপ্রসারী ‘ডুয়াল-ব্র্যান্ডিং’ কৌশল। যেখানে একদল আইনি ও সংসদীয় স্তরে লড়াই চালাবে আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে রাস্তায় নেমে রাজনীতি করবেন।
আইনি লড়াইয়ের রায় যে দিকেই যাক, আদালত বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি দিক বা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-র শিবিরকে, পশ্চিমবঙ্গের মূল রাজনৈতিক পরিসর জুড়ে কিন্তু কোনো না কোনোভাবে ‘তৃণমূলের উত্তরাধিকার’-ই বজায় থাকবে। এর ফলে বাম বা কংগ্রেসের মতো বিরোধী দলগুলি রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের কোনো সুযোগই পাবে না।
রাজনীতিতে অনেক সময় বড় বিপর্যয় এড়াতে ‘নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ’ ঘটানো হয়। নেপথ্য থেকে এই বিদ্রোহকে প্রশ্রয় দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মূলত নির্বাচনী হারের সমস্ত দায় ঝেড়ে ফেললেন, দলের ভেতরের বিরোধীদের কোণঠাসা করলেন এবং নিজের শর্তে নতুন করে রাজনৈতিক সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের এক সোনালী সুযোগ তৈরি করে নিলেন।


