চন্দন দাসঃ
আজকাল খবরের কাগজ খুললেই বা টিভির পর্দায় চোখ রাখলেই তুমি একটা শব্দ বারবার শুনতে পাবে— ‘রেভড়ি’ বা ফ্রিবি (Freebie) মানে ভাতা আর সামাজিক প্রকল্প, সে রাজ্য হোক বা কেন্দ্র।
বিশেষ করে ২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে ভারতের রাজনীতি এমন এক মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ভোট জেতার প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে সরাসরি নগদ অর্থ প্রদান বা বিনামূল্যে বিদ্যুৎ-জলের মতো পরিষেবা। কিন্তু তুমি কি কখনো ভেবে দেখেছ, এই ‘বিনামূল্যে’ পাওয়া জিনিসের আসল দামটা কত?
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই সস্তার জনপ্রিয়তার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদী পরিকাঠামো।
তুমি যদি ভারতের রাজ্যগুলোর আর্থিক খতিয়ান লক্ষ্য করো, তবে দেখবে গত কয়েক বছরে ভর্তুকি বা সাবসিডির বোঝা আকাশছোঁয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের পরিসংখ্যান বলছে, ভারতের ১২টি প্রধান রাজ্য শুধুমাত্র মহিলাদের নগদ অর্থ প্রদানের প্রকল্পের জন্য বছরে প্রায় ১.৬৮ লক্ষ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। এটা ভারতের মোট জিডিপির (GDP) প্রায় ০.৫ শতাংশ। আরও ভয়ের কথা হলো, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কোনো উৎপাদনশীল কাজে লাগছে না; এটি স্রেফ সরাসরি ভোগব্যয় (Consumption) হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ ছিঃ ট্রাম্প ছিঃ; ভারতকে ‘নরককুণ্ড’ বললেন ট্রাম্প! ক্ষোভে ফেটে পড়ল ভারত
রাজ্যভিত্তিক ভর্তুকির চিত্রটা একবার দেখো:
মোট ভর্তুকি: ২০২৫ অর্থবর্ষে রাজ্যগুলোর মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪.৭ লক্ষ কোটি টাকা।
বৃদ্ধির হার: গত তিন বছরে এই ভর্তুকির বোঝা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তুমি ভাবলে অবাক হবে যে, প্রতি বছর গড়ে ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ছে ১২ থেকে ১৫ শতাংশ হারে।
ঋণের বোঝা: ভারতের রাজ্যগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ গত এক দশকে তিনগুণ বেড়েছে। ২০১৪ সালে যেখানে ঋণের পরিমাণ ছিল ১৭.৫৭ লক্ষ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫৯.৬০ লক্ষ কোটি টাকায়। আর ২০২৬-এর বর্তমান হিসেবে তা আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
তুমি হয়তো ভাবছ, গরিব মানুষকে টাকা দিলে ক্ষতি কী? ক্ষতিটা হচ্ছে ‘অপরচুনিটি কস্ট’ বা সুযোগের ব্যয়ে। সরকার যখন ১.৬৮ লক্ষ কোটি টাকা নগদ বিলায়, তখন সেই টাকাটা আসে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের বাজেট কেটে। ভারতের জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP 2020) অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ খরচ করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী হচ্ছে? ২০২৪-২৫ এবং ২৫-২৬ অর্থবর্ষেও এই বরাদ্দ ৪.১ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে।
এখানে একটা তুলনামূলক হিসাব দেখো যা তোমাকে চমকে দেবে:
১. ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের মোট বাজেট বরাদ্দ প্রায় ১.৩৯ লক্ষ কোটি টাকা।
২. অথচ মাত্র ১২টি রাজ্যের নগদ বিলানোর প্রকল্পের বাজেট ১.৬৮ লক্ষ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, গোটা দেশের শিক্ষার জন্য কেন্দ্র যা খরচ করছে, তার চেয়ে বেশি টাকা কয়েকটি রাজ্য স্রেফ ভোট টানার জন্য নগদ বিলিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে কী হচ্ছে? নতুন স্কুল তৈরি হচ্ছে না, পুরনো স্কুলের ল্যাবরেটরি আধুনিক হচ্ছে না এবং শিক্ষকদের সঠিক প্রশিক্ষণ দেওয়া যাচ্ছে না।
তুমি যদি পশ্চিমবঙ্গের বা পাঞ্জাবের মতো রাজ্যগুলোর দিকে তাকাও, দেখবে সেখানে ঋণের সুদ মেটাতেই রাজস্বের এক-পঞ্চমাংশ (২০ শতাংশ) শেষ হয়ে যাচ্ছে।
ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচার (Capex) বনাম ভোগব্যয়:
তুমি যখন নিজের বাড়ির বাজেট করো, তখন তুমি ভাবো কতটা টাকা চাল-ডালে খরচ হবে আর কতটা টাকা দিয়ে বাড়ি মেরামত বা নতুন সম্পদ তৈরি করা হবে। সরকারের ক্ষেত্রেও তাই। ‘ক্যাপেক্স’ বা মূলধনী ব্যয় হলো সেই টাকা, যা দিয়ে রাস্তা, ব্রিজ, স্কুল বা হাসপাতাল তৈরি হয়—যা ভবিষ্যতে আয় বাড়াতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, খয়রাতি বা নগদ বণ্টন হলো স্রেফ ভোগব্যয়।
পরিসংখ্যান বলছে, এই খয়রাতি সংস্কৃতির কারণে ভারতের রাজ্যগুলো তাদের পরিকাঠামো বাজেট ছাঁটাই করতে বাধ্য হচ্ছে।
বিপজ্জনক প্রবণতা: আরবিআই (RBI) এবং সিএজি (CAG)-এর তথ্য অনুযায়ী, যখনই কোনো রাজ্যের রাজস্ব আদায় কমে যায়, তারা সবার আগে তাদের পরিকাঠামো বা সম্পদ তৈরির বাজেট থেকে ১৯ শতাংশ টাকা কেটে নেয়। কেন জানো? কারণ সরকারি কর্মচারীদের বেতন বা রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় ‘ফ্রিবি’ বা নগদ টাকা দেওয়া বন্ধ করা ভোটের বাজারে আত্মঘাতী।
তুলনামূলক চিত্র: পাঞ্জাবের মতো রাজ্য যেখানে তাদের বাজেটের মাত্র ৫.৫ শতাংশ খরচ করে পরিকাঠামো তৈরিতে, সেখানে গুজরাটের মতো রাজ্য খরচ করে প্রায় ২৫.৩ শতাংশ। এই বৈষম্যই ঠিক করে দেয় কোন রাজ্য ভবিষ্যতে শিল্পায়নে এগিয়ে যাবে আর কোন রাজ্য পিছিয়ে পড়বে।
ঋণের ফাঁদ: আমরা কি দেউলিয়া হওয়ার পথে?
তুমি কি জানো, বর্তমানে অনেক রাজ্য স্রেফ আগের নেওয়া ঋণের সুদ মেটানোর জন্য নতুন করে ঋণ নিচ্ছে? এটাকে অর্থনীতিতে ‘ডেবট ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদ বলা হয়। এন.কে. সিং কমিটির সুপারিশ ছিল যে, কেন্দ্র ও রাজ্যের সম্মিলিত ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশের মধ্যে থাকা উচিত। কিন্তু ২০২৬-এর এই সময়ে দাঁড়িয়ে সেই ঋণের পরিমাণ জিডিপির প্রায় ৮২ শতাংশে পৌঁছেছে।
হ্যাঁ ঠিকই পড়েছো প্রায় ৮২ শতাংশ!
রাজ্যগুলোর এই ঋণের চরিত্র বদলাচ্ছে অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে:
অনুৎপাদনশীল ঋণ: আগে রাজ্যগুলো ঋণ নিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা সেচ প্রকল্প বানানোর জন্য। কিন্তু এখন অন্ধ্রপ্রদেশ বা পাঞ্জাবের মতো রাজ্যগুলোতে নতুন নেওয়া ঋণের ৭৫ শতাংশের বেশি খরচ হচ্ছে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ এবং খয়রাতি প্রকল্প চালাতে। অর্থাৎ, আমরা ঘাস কাটার জন্য কুড়ুল (axe) ধার করছি না, বরং কুড়ুল বিক্রি করে ঘাস কিনছি।
সুদের বোঝা: পশ্চিমবঙ্গ বা কেরলের মতো রাজ্যগুলোতে সংগৃহীত মোট রাজস্বের প্রায় ২০ শতাংশ বা তার বেশি টাকা স্রেফ ঋণের সুদ মেটাতে চলে যাচ্ছে। এর মানে হলো, তোমার দেওয়া ট্যাক্সের প্রতি ৫ টাকার মধ্যে ১ টাকা খরচ হচ্ছে পুরনো ঋণের সুদ দিতে, যা কোনো উন্নয়নমূলক কাজে লাগছে না।
খয়রাতি রাজনীতির অন্যতম বড় শিকার হলো আমাদের বিদ্যুৎ বন্টন সংস্থাগুলো (DISCOMS)। তুমি হয়তো ভাবছ মাসে ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ বিনামূল্যে পাচ্ছ মানে তোমার লাভ হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এই ‘ফ্রি’ বিদ্যুতের ভর্তুকি মেটাতে গিয়ে রাজ্য সরকারগুলো বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সঠিক সময়ে টাকা দিচ্ছে না।
ভর্তুকির অংক: ভারতের মোট রাজ্যভিত্তিক ভর্তুকির একটা বিশাল অংশ (প্রায় ৩০-৪০%) ব্যয় হয় বিদ্যুৎ খাতে।
ফলাফল: এর ফলে বিদ্যুৎ সংস্থাগুলো আধুনিক হতে পারছে না, লাইন লস বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের মান কমছে। দীর্ঘমেয়াদে এটা শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তুমি যদি মনোযোগ দিয়ে দেখো, তবে বুঝবে যে রাজ্যগুলো আজ ‘রেভড়ি’র জন্য যে টাকা খরচ করছে, তা আসলে ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে চুরি করা টাকা।
আমরা যদি আজ শিক্ষা বা কারখানায় বিনিয়োগ না করি, তবে আগামী ১০ বছর পর আমাদের যুবসমাজ স্রেফ এই মাসিক ১০০০ বা ২০০০ টাকার সরকারি অনুদানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে, যা কোনো সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়।
এবার হয়তো তুমি ভাবছ, তবে কি গরিব মানুষকে সাহায্য করা বন্ধ করে দিতে হবে? একদমই নয়। কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু সমস্যার সমাধান রয়েছে সাহায্যের ধরণ পরিবর্তনের মধ্যে।
শর্তাধীন নগদ হস্তান্তর (Conditional Cash Transfers): আমরা যদি কোনো শর্ত ছাড়াই টাকা বিলিয়ে যাই, তবে তা অলসতা তৈরি করে। কিন্তু এই টাকাই যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা দক্ষতা উন্নয়নের (Skill Development) সাথে যুক্ত করে দেওয়া হয়—যেমন, “সন্তানকে স্কুলে পাঠালে বা নির্দিষ্ট ভোকেশনাল ট্রেনিং নিলে তবেই এই ভাতা পাওয়া যাবে”—তবে তা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ তৈরিতে সাহায্য করবে।
পরিকাঠামোয় বিনিয়োগই আসল ক্ষমতায়ন: তুমি যদি কাউকে মাছ কিনে দাও, তবে সে একদিন খেতে পারবে; কিন্তু যদি তাকে মাছ ধরা শিখিয়ে দাও এবং তার জন্য একটি পুকুর (পরিকাঠামো) তৈরি করে দাও, তবে সে সারা জীবন খেতে পারবে। রাজ্যগুলোকে বুঝতে হবে যে, ১০০০ কোটি টাকা নগদ বিলানোর চেয়ে ১০০০ কোটি টাকা খরচ করে একটি টেকনিক্যাল কলেজ বা ফুড প্রসেসিং পার্ক তৈরি করলে তা হাজার হাজার যুবকের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে।
রাজকোষীয় শৃঙ্খলা (Fiscal Discipline) ও স্বচ্ছতা
অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজ্যগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য কিছু কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি:
ভর্তুকির অডিট: প্রতিটি রাজ্যে একটি স্বাধীন সংস্থা থাকা উচিত যারা খতিয়ে দেখবে কোন ভর্তুকিগুলো সত্যিই দারিদ্র্য বিমোচনে সাহায্য করছে আর কোনগুলো স্রেফ রাজনৈতিক ফায়দার জন্য।
ক্যাপেক্স রক্ষা: রাজ্য বাজেটগুলোতে এমন একটি নিয়ম থাকা দরকার যাতে কোনো অবস্থাতেই পরিকাঠামো উন্নয়নের (Capex) টাকা কেটে খয়রাতি প্রকল্পে ব্যয় না করা হয়। ২০২৬ সালের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, যে রাজ্যগুলো তাদের জিডিপির অন্তত ৩ শতাংশ পরিকাঠামোয় খরচ করে, তারা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকে।
আরও পড়ুনঃ ইতিহাস সৃষ্টি করতে চলেছে বাংলা; বললেন মনোজ
ভারতের এই ‘রেভড়ি’ বনাম ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা উন্নয়ন বিতর্কের শেষ কথা হলো সচেতনতা। তুমি যখন নাগরিক হিসেবে স্রেফ নগদ প্রাপ্তির আশায় ভোট দাও, তখন তুমি আসলে নিজের সন্তানদের শিক্ষার বাজেট এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বিক্রি করে দিচ্ছ।
মনে রেখো আজ যে বিদ্যুৎ তুমি বিনামূল্যে পাচ্ছ, তার জন্য হয়তো কাল তোমার ভাই বা বোন কোনো কারখানায় কাজ পাবে না কারণ সেই বিদ্যুৎ কোম্পানিটি দেউলিয়া হয়ে গেছে।
ভারতের লক্ষ্য হওয়া উচিত ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার বরাদ্দকে জিডিপির ৬ শতাংশে নিয়ে যাওয়া এবং ক্যাপিটাল এক্সপেন্ডিচারকে অন্তত ৪ শতাংশে স্থির রাখা। তবেই ভারত মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশে উন্নীত হতে পারবে।
খয়রাতি রাজনীতি হয়তো সাময়িক আরাম দেয়, কিন্তু তা জাতিকে পঙ্গু করে দেয়। তোমার এবং আমার মতো তরুণদেরই দাবি তুলতে হবে—আমাদের ‘রেভড়ি’ নয়, আমাদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত পরিকাঠামো চাই।
বদল হোক বদল হোক করছি কিন্তু দিন শেষে সেই তো ভাতাতেই খুশি।
একটি দেশ তার জনগণের দেওয়া নগদ টাকায় নয়, বরং তাদের সৃজনশীলতা ও পরিশ্রমের ওপর দাঁড়িয়ে শক্তিশালী হয়।
যদি এখনও বুঝতে না পারি, তাহলে পরের প্রজন্মের সর্বনাশের জন্যে দায়ী থাকবো আমরা প্রত্যেকেই।



