আজকে ইতু পূজা — বাংলার এক প্রাচীন লোকউৎসব ও শস্যমঙ্গল ব্রত
বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এক প্রাচীন ব্রত হল ইতু পূজা। আজকের দিনে পালিত এই পূজা শুধুমাত্র ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটি বাঙালির শস্যসংস্কৃতি, প্রকৃতিপূজা ও জীবনদর্শনের এক অনন্য প্রকাশ।
আরও পড়ুনঃ এবার SIR হিয়ারিংয়ের পালা; ডাকা হবে কাদের? স্পষ্ট জানাল কমিশন
ইতু পূজা বাঙালিদের একটি লোকউৎসব, যা মূলত অগ্রহায়ণ মাসে প্রতি রবিবার শস্যবৃদ্ধি ও মোক্ষকামনায় অনুষ্ঠিত হয়। এই ব্রত কার্তিক সংক্রান্তিতে শুরু হয়ে অগ্রহায়ণ মাসের শেষে সমাপ্ত হয়। দীর্ঘ এই সময়জুড়ে নারীরা নিয়ম ও নিষ্ঠার সঙ্গে মা ইতুর ব্রত পালন করেন।
পূজার মূল ভাবনা ও আচার
ইতু পূজার প্রধান বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতি ও শস্যের সঙ্গে তার গভীর যোগ।
এই পূজায় মাটির পাত্রে বিভিন্ন শস্যের বীজ ও গাছ পুঁতে তার পূজা করা হয়। ধান, ডাল, শাক-সবজি, ঘাস কিংবা বিভিন্ন বীজ এই পাত্রে রোপণ করা হয়, যা আসলে শস্যবৃদ্ধি ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক।
এই ব্রত পালনের মাধ্যমে প্রার্থনা করা হয়—
ভালো ফসল,
সংসারের সমৃদ্ধি,
রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তি,
এবং আত্মিক শান্তি ও মোক্ষলাভ।
সূর্যদেবতা ও লক্ষ্মী ব্রত হিসেবে ইতু পূজা
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী ইতু পূজা কখনও সূর্যদেবতার ব্রত, আবার অনেক অঞ্চলে এটি মা লক্ষ্মীর ব্রত হিসেবেও পালিত হয়। সূর্যের কৃপায় ফসল বৃদ্ধি ও লক্ষ্মীর আশীর্বাদে সংসারে ঐশ্বর্য—এই দুই বিশ্বাসই ইতু পূজার সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
আরও পড়ুনঃ ডাকাতদের দ্বারা পূজিত হতেন মধ্যযুগে; মালদার এই মন্দিরে পুজো দিলেই নাকি পূরণ হয় মনস্কামনা!
নারীর জীবনে ইতু পূজার গুরুত্ব
এই ব্রত প্রধানত নারীরাই পালন করেন।
স্বামীর মঙ্গল, সন্তানের সুস্থতা, পরিবারের সুখ ও দীর্ঘায়ু কামনায় মা ইতুর চরণে নিজেদের প্রার্থনা নিবেদন করেন তাঁরা। ইতু পূজা তাই নারীর বিশ্বাস, ধৈর্য ও আশার এক নীরব প্রতিফলন।
ব্রতকথা ও লোকবিশ্বাস
ইতু পূজার সঙ্গে প্রচলিত ব্রতকথায় বলা হয়—
যিনি নিষ্ঠা ও বিশ্বাসের সঙ্গে মা ইতুর পূজা করেন, তাঁর জীবনে দুঃখ কাটে, অভাব দূর হয় এবং সংসারে ফিরে আসে শান্তি ও সমৃদ্ধি।
এই ব্রতকথা লোকজ নীতিশিক্ষার মাধ্যমে জীবনের প্রতি আস্থা জাগিয়ে তোলে।
আধুনিক জীবনে এই ব্রত কিছুটা হারিয়ে গেলেও, আজও গ্রামবাংলার বহু ঘরে কার্তিক সংক্রান্তি থেকে অগ্রহায়ণ মাসের শেষ রবিবার পর্যন্ত মা ইতুর পূজা নিষ্ঠার সঙ্গে পালিত হয়।
ইতু পূজা আজও বাঙালির লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ঐতিহ্য।





